লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপনিবেশোত্তর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপান্তর ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব

ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বাঙালিদের 'অযোদ্ধা জাতি' হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রচার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভুল প্রমাণিত হয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে নানা ‘পুরুষোচিত’ খেলাধুলায়, যেমন বক্সিং, বাঙালি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের পরীক্ষিত সাফল্যের পরও, এমনকি স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত যুদ্ধে পাঞ্জাব ফ্রন্টে বাঙালিদের নিয়ে গঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ অন্যদের তুলনায় বিপুল শৌর্য ও সাফল্য প্রদর্শন করার পরও, পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক পাকিস্তানি নয়া-ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি বাঙালিদের ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা অব্যাহত রাখে। বাঙালি মেজরদের নেতৃত্বে স্বল্প প্রশিক্ষিত তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা মাত্র নয় মাসে সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছর পর বাংলা ভাষা উর্দুর আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেলেও, আধুনিক বাংলা ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বাংলাভাষীরা হিন্দির আগ্রাসনের মুখে নিজস্ব ভাষা রক্ষায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মুক্তি ও সাম্য ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিক প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে যখন চাকমা, মার্মা, গারো ও ত্রিপুরার মতো সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল প্রকাশিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং পরদিন তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা’ ভিত্তিক ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল।২৭৮

তবে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে লীগ সরকার অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি, যার ফলে সংবিধান জনগণের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন হতে ব্যর্থ হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ লীগ-নেতৃত্বের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ে সক্রিয় থাকলেও তাদের মননের বিউপনিবেশায়ন ঘটেনি। এর বড় প্রমাণ হলো 'পিপলস্ রিপাবলিক' এর বাংলা অনুবাদ 'গণপ্রজাতন্ত্রী' করা, যা নাগরিকদের 'নাগরিক' না করে ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থার 'প্রজা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের জনস্বার্থবিরোধী অনেক আইনকানুন বজায় থাকে। স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাসের ওপর একাধিপত্য কায়েমের প্রয়াসে অন্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে প্রান্তিক করে ফেলে, যা দেশটির গণতান্ত্রিক বিকাশের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। এসব উপনিবেশবাদী অপতৎপরতা সত্ত্বেও, ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করে, যা এখনো সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।২৭৯ কিন্তু এই সাংবিধানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে, উচ্চ আদালতে আইনি তর্ক-বিতর্ক পরিচালনায় কিংবা উচ্চশিক্ষা চর্চায় এখনো ইংরেজি ভাষারই মর্যাদাবান অবস্থান জারি রয়েছে। তথ্যসূত্র: ২৭৮. দেখুন, The Proclamation of Independence, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪-৫ ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৭-১১২৭৯. দেখুন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৩

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: বিস্তারিত তথ্য চেয়ে জেদ্দার চিঠি

উপনিবেশোত্তর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপান্তর ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৩৫:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বাঙালিদের 'অযোদ্ধা জাতি' হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রচার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভুল প্রমাণিত হয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে নানা ‘পুরুষোচিত’ খেলাধুলায়, যেমন বক্সিং, বাঙালি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের পরীক্ষিত সাফল্যের পরও, এমনকি স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত যুদ্ধে পাঞ্জাব ফ্রন্টে বাঙালিদের নিয়ে গঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ অন্যদের তুলনায় বিপুল শৌর্য ও সাফল্য প্রদর্শন করার পরও, পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক পাকিস্তানি নয়া-ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি বাঙালিদের ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা অব্যাহত রাখে। বাঙালি মেজরদের নেতৃত্বে স্বল্প প্রশিক্ষিত তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা মাত্র নয় মাসে সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছর পর বাংলা ভাষা উর্দুর আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেলেও, আধুনিক বাংলা ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বাংলাভাষীরা হিন্দির আগ্রাসনের মুখে নিজস্ব ভাষা রক্ষায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক মুক্তি ও সাম্য ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিক প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে যখন চাকমা, মার্মা, গারো ও ত্রিপুরার মতো সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল প্রকাশিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং পরদিন তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা’ ভিত্তিক ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল।২৭৮

তবে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে লীগ সরকার অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি, যার ফলে সংবিধান জনগণের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন হতে ব্যর্থ হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ লীগ-নেতৃত্বের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ে সক্রিয় থাকলেও তাদের মননের বিউপনিবেশায়ন ঘটেনি। এর বড় প্রমাণ হলো 'পিপলস্ রিপাবলিক' এর বাংলা অনুবাদ 'গণপ্রজাতন্ত্রী' করা, যা নাগরিকদের 'নাগরিক' না করে ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থার 'প্রজা' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

এই ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের জনস্বার্থবিরোধী অনেক আইনকানুন বজায় থাকে। স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাসের ওপর একাধিপত্য কায়েমের প্রয়াসে অন্য রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে প্রান্তিক করে ফেলে, যা দেশটির গণতান্ত্রিক বিকাশের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। এসব উপনিবেশবাদী অপতৎপরতা সত্ত্বেও, ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে ঘোষণা করে, যা এখনো সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে।২৭৯ কিন্তু এই সাংবিধানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে, উচ্চ আদালতে আইনি তর্ক-বিতর্ক পরিচালনায় কিংবা উচ্চশিক্ষা চর্চায় এখনো ইংরেজি ভাষারই মর্যাদাবান অবস্থান জারি রয়েছে। তথ্যসূত্র: ২৭৮. দেখুন, The Proclamation of Independence, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪-৫ ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৭-১১২৭৯. দেখুন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৩