লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চকরিয়ায় সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের বুক চিরে পাহাড় কেটে পাকা সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশ পড়েছে গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের ভেতর। বন বিভাগের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার পাঁচ দিন পরও ঠিকাদারের লোকজন সেখানে পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিসের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে যাওয়া কাঁচা ও ইট বিছানো সরু পথটিতে পাহাড় কাটার ব্যাপক চিহ্ন দেখা গেছে। উত্তর করমুহুরীপাড়া এবং সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুট এলাকা জুড়ে ৫ থেকে ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে পথটি ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া করা হয়েছে। সড়কটি প্রশস্ত করতে গিয়ে কাটা পড়েছে বেশ কিছু গাছও। বন্য হাতির চলাচলের এই বনে সড়কের পাশে রয়েছে গর্জনগাছ ও প্রায় ৫০ একরের সুফল বনায়ন। প্রকল্প গ্রহণের আগে বন বিভাগের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার অর্থায়নে এলজিইডির ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় এই সড়কটি নির্মিত হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই এবং প্রতিটি সংস্থার এই আইন মেনে চলা উচিত। বনের ভেতর সড়ক হলে জবরদখলসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।

বন বিভাগ গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম পাহাড় কাটার বিষয়টি টের পায়। এর পাঁচ দিন পর চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান কাজ বন্ধ করতে এলজিইডিকে চিঠি দেন। কিন্তু কাজ থামেনি। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। এ ঘটনায় বন বিভাগ আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সড়কটি পাকা হলে বনের ভেতর যানবাহন ও মানুষের প্রবেশ সহজ হবে, যার ফলে গাছ চুরি ও বন্য প্রাণী শিকারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল ২০২০ সালে। তিনি বলেন, ভুল হইতেই পারে। আমরা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছি না। রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে কাজ করা আমাদের ম্যান্ডেটও নয়। বন বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর তিনি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।

শুধু হারবাং নয়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আরও তিনটি সংরক্ষিত বনে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া হাতি করিডরের অংশ। এছাড়া মহেশখালীর শাপলাপুরে জাইকার অর্থায়নে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ওপর গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিলেও কাজ চলার তথ্য মিলেছে। সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতরেও দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করলে বন খণ্ডিত হয়ে যাবে। এতে অবৈধ প্রবেশ, জবরদখল ও গাছ কাটা বাড়বে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

একটি ৫৭০ মিটার দীর্ঘ বড়ুয়াপাড়া সড়ক, যার পুরোটাই সংরক্ষিত বনের মধ্যে বলে বন বিভাগের দাবি।

আর সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার পর্যন্ত ৬০০ মিটার সড়কের প্রায় ১৭০ মিটার পড়েছে সংরক্ষিত বনে।জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চুয়েটে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে ছুটির দিনেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

চকরিয়ায় সংরক্ষিত বন ও পাহাড় কেটে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৩৭:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারের চকরিয়ায় শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের বুক চিরে পাহাড় কেটে পাকা সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশ পড়েছে গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের ভেতর। বন বিভাগের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার পাঁচ দিন পরও ঠিকাদারের লোকজন সেখানে পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিসের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে যাওয়া কাঁচা ও ইট বিছানো সরু পথটিতে পাহাড় কাটার ব্যাপক চিহ্ন দেখা গেছে। উত্তর করমুহুরীপাড়া এবং সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুট এলাকা জুড়ে ৫ থেকে ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে পথটি ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া করা হয়েছে। সড়কটি প্রশস্ত করতে গিয়ে কাটা পড়েছে বেশ কিছু গাছও। বন্য হাতির চলাচলের এই বনে সড়কের পাশে রয়েছে গর্জনগাছ ও প্রায় ৫০ একরের সুফল বনায়ন। প্রকল্প গ্রহণের আগে বন বিভাগের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার অর্থায়নে এলজিইডির ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় এই সড়কটি নির্মিত হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই এবং প্রতিটি সংস্থার এই আইন মেনে চলা উচিত। বনের ভেতর সড়ক হলে জবরদখলসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।

বন বিভাগ গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম পাহাড় কাটার বিষয়টি টের পায়। এর পাঁচ দিন পর চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান কাজ বন্ধ করতে এলজিইডিকে চিঠি দেন। কিন্তু কাজ থামেনি। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। এ ঘটনায় বন বিভাগ আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সড়কটি পাকা হলে বনের ভেতর যানবাহন ও মানুষের প্রবেশ সহজ হবে, যার ফলে গাছ চুরি ও বন্য প্রাণী শিকারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল ২০২০ সালে। তিনি বলেন, ভুল হইতেই পারে। আমরা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছি না। রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে কাজ করা আমাদের ম্যান্ডেটও নয়। বন বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর তিনি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।

শুধু হারবাং নয়, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আরও তিনটি সংরক্ষিত বনে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে। চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া হাতি করিডরের অংশ। এছাড়া মহেশখালীর শাপলাপুরে জাইকার অর্থায়নে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ওপর গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিলেও কাজ চলার তথ্য মিলেছে। সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতরেও দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করলে বন খণ্ডিত হয়ে যাবে। এতে অবৈধ প্রবেশ, জবরদখল ও গাছ কাটা বাড়বে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

একটি ৫৭০ মিটার দীর্ঘ বড়ুয়াপাড়া সড়ক, যার পুরোটাই সংরক্ষিত বনের মধ্যে বলে বন বিভাগের দাবি।

আর সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার পর্যন্ত ৬০০ মিটার সড়কের প্রায় ১৭০ মিটার পড়েছে সংরক্ষিত বনে।জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হবে।