লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাণীর প্রতি মমতা ও ইসলাম: ইসলামের মানবিক শিক্ষা ও নির্দেশনা

মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনেই এই বিবেকের প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় সবার সঙ্গে কোমল ও সদয় আচরণ করতে। মানুষের প্রতি সদয় হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। পশু-পাখি আল্লাহর সৃষ্টি এবং এদের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ইসলাম শান্তির ধর্ম, আর এই ধর্মে কারো ওপর অত্যাচার করার কোনো সুযোগ নেই; তা মানুষ হোক বা অবলা জীবজন্তু। জীবের প্রতি মানবিক আচরণ করা পুণ্যময় কাজ, যা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। বিপরীতে, প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ করা মারাত্মক গোনাহের কাজ, যা জাহান্নামের কারণ হতে পারে।

গৃহপালিত পশুপাখির প্রতি মানুষের বিশেষ হক বা অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সময়মতো পানাহার করানো, তাদের থাকার সুব্যবস্থা করা, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ না নেওয়া এবং তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার আচরণ করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন' (সুনানে আবি দাউদ : ৪৯৪১)। যে দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয় বলে নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন (বোখারি : ৫৯৯৭)।

পৃথিবীর সৃষ্টিসমূহ মানুষের কল্যাণের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। মানুষ এদের থেকে খাদ্য, বস্ত্র, বোঝা বহন ও যাতায়াতের মতো বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করে। এসব উপকারের বিনিময়ে মানুষ কৃতজ্ঞতা আদায় করবে এবং ইবাদতে মনোযোগী হবে, এটাই আল্লাহর প্রত্যাশা। সুরা নাহলের ৫-৮ আয়াতে আল্লাহতায়ালা চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য প্রাণীর উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। গৃহপালিত প্রাণীর সেবাযত্ন না করা বা অলসতা করা হলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) একবার এক আনসারির খেজুর বাগানে একটি উট দেখে সেটির মালিককে ডেকে সতর্ক করেছিলেন এবং বলেছিলেন, 'আল্লাহ যে তোমাকে এ নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর অধিকারের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং একে কষ্ট দাও' (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৪৯)।

প্রাণীদের অহেতুক কষ্ট দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। সাহাবি আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, তারা কোনো স্থানে অবতরণ করলে বাহনের পিঠ থেকে হাওদা না নামিয়ে এবং তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা না করে সালাত আদায় করতেন না (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৫১)। রাসুল (সা.) পশুকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য জবাই করার সময় ছুরি ধারালো করতে এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (তিরমিজি : ১৪০৯)। এছাড়া গর্তে প্রস্রাব করা, প্রাণীর মুখে আঘাত করা বা সেক দেওয়াও নিষেধ করা হয়েছে (সুনানে আবি দাউদ : ২৯; মুসলিম : ২১১৬)। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) গাধার মুখে দাগ দেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তির ওপর অভিসম্পাত করেছিলেন (মুসলিম : ২১১৭)।

সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে ছোট কাজের বিনিময়েও অসামান্য প্রতিদান পাওয়া যায়। তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৫০)। অন্যদিকে, বিড়াল আটকে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার অপরাধে এক নারীকে জাহান্নামি বলে ঘোষণা করা হয়েছিল (মুসলিম : ২২৪২)। পিঁপড়ার বাসা জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাতেও আল্লাহতায়ালা নবীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, কারণ পিঁপড়াও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছিল (মুসলিম : ৫৬৫৪)। রাসুল (সা.) অন্যায়ভাবে চড়ুই বা ছোট কোনো প্রাণীকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বাকশক্তিহীন প্রাণীর অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে সাহাবিদের তাগিদ দিয়েছেন (সুনানে নাসায়ি : ৪৪৪৬; সুনানে আবি দাউদ : ২৫৪৮)।

জনপ্রিয় সংবাদ

তাপপ্রবাহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ক্ষতি

প্রাণীর প্রতি মমতা ও ইসলাম: ইসলামের মানবিক শিক্ষা ও নির্দেশনা

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:১৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিবেক-বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে সম্মানিত করেছেন। মানুষের প্রতিটি কাজের পেছনেই এই বিবেকের প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়। ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয় সবার সঙ্গে কোমল ও সদয় আচরণ করতে। মানুষের প্রতি সদয় হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। পশু-পাখি আল্লাহর সৃষ্টি এবং এদের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়া আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। ইসলাম শান্তির ধর্ম, আর এই ধর্মে কারো ওপর অত্যাচার করার কোনো সুযোগ নেই; তা মানুষ হোক বা অবলা জীবজন্তু। জীবের প্রতি মানবিক আচরণ করা পুণ্যময় কাজ, যা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। বিপরীতে, প্রাণীর প্রতি অমানবিক আচরণ করা মারাত্মক গোনাহের কাজ, যা জাহান্নামের কারণ হতে পারে।

গৃহপালিত পশুপাখির প্রতি মানুষের বিশেষ হক বা অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সময়মতো পানাহার করানো, তাদের থাকার সুব্যবস্থা করা, সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ না নেওয়া এবং তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার আচরণ করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন' (সুনানে আবি দাউদ : ৪৯৪১)। যে দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয় বলে নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন (বোখারি : ৫৯৯৭)।

পৃথিবীর সৃষ্টিসমূহ মানুষের কল্যাণের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। মানুষ এদের থেকে খাদ্য, বস্ত্র, বোঝা বহন ও যাতায়াতের মতো বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করে। এসব উপকারের বিনিময়ে মানুষ কৃতজ্ঞতা আদায় করবে এবং ইবাদতে মনোযোগী হবে, এটাই আল্লাহর প্রত্যাশা। সুরা নাহলের ৫-৮ আয়াতে আল্লাহতায়ালা চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য প্রাণীর উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। গৃহপালিত প্রাণীর সেবাযত্ন না করা বা অলসতা করা হলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) একবার এক আনসারির খেজুর বাগানে একটি উট দেখে সেটির মালিককে ডেকে সতর্ক করেছিলেন এবং বলেছিলেন, 'আল্লাহ যে তোমাকে এ নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর অধিকারের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং একে কষ্ট দাও' (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৪৯)।

প্রাণীদের অহেতুক কষ্ট দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। সাহাবি আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, তারা কোনো স্থানে অবতরণ করলে বাহনের পিঠ থেকে হাওদা না নামিয়ে এবং তাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা না করে সালাত আদায় করতেন না (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৫১)। রাসুল (সা.) পশুকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য জবাই করার সময় ছুরি ধারালো করতে এবং জবাইয়ের পশুকে আরাম দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (তিরমিজি : ১৪০৯)। এছাড়া গর্তে প্রস্রাব করা, প্রাণীর মুখে আঘাত করা বা সেক দেওয়াও নিষেধ করা হয়েছে (সুনানে আবি দাউদ : ২৯; মুসলিম : ২১১৬)। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) গাধার মুখে দাগ দেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তির ওপর অভিসম্পাত করেছিলেন (মুসলিম : ২১১৭)।

সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করলে ছোট কাজের বিনিময়েও অসামান্য প্রতিদান পাওয়া যায়। তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক ব্যক্তি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন (সুনানে আবি দাউদ : ২৫৫০)। অন্যদিকে, বিড়াল আটকে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার অপরাধে এক নারীকে জাহান্নামি বলে ঘোষণা করা হয়েছিল (মুসলিম : ২২৪২)। পিঁপড়ার বাসা জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাতেও আল্লাহতায়ালা নবীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, কারণ পিঁপড়াও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করছিল (মুসলিম : ৫৬৫৪)। রাসুল (সা.) অন্যায়ভাবে চড়ুই বা ছোট কোনো প্রাণীকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বাকশক্তিহীন প্রাণীর অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে সাহাবিদের তাগিদ দিয়েছেন (সুনানে নাসায়ি : ৪৪৪৬; সুনানে আবি দাউদ : ২৫৪৮)।