লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৩ বছর পরও আইসিটি শিক্ষকহীন অনেক সরকারি কলেজ ও বিদ্যালয়

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ১৩ বছর আগে। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও অনেক সরকারি কলেজে নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক নেই। এমনকি দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটিতেও এই বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে আইসিটি বাধ্যতামূলক করার পর থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত অংশ নিলেও, শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় শুরু থেকেই সংকট রয়ে গেছে।

শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা বা অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকেরা আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন। কোথাও আবার প্রোগ্রামার, অতিথি বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা ঘুরেফিরে এই বিষয়টি পড়ান। জনবল সংকটের কারণে আইসিটির ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হয় না বলে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বদলে কেবল পরীক্ষামুখী পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

বর্তমানে দেশে সরকারি কলেজ রয়েছে ৭০৮টি, যার মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারি হওয়া পুরোনো কলেজগুলোর মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি। তবে ১৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষকের পদ রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া ৩৬৩টি কলেজের মধ্যে ১০২টিতেও কোনো পদ নেই। ২০১৬ সালে সরকারি কলেজে ২৫৫টি এবং পরবর্তীতে আরও ১৮টি ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ধীর। ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক যোগ দেন, যাদের মধ্যে বর্তমানে ১৩২ জন কর্মরত আছেন।

প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয়ে অন্তত একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষকের পদ থাকার কথা থাকলেও আইসিটির ক্ষেত্রে অধিকাংশ কলেজে সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সর্বশেষ ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে সুপারিশ করা হলেও তাঁদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া ৫১টি সরকারি কলেজে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত ২৯১টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে, ফলে পদোন্নতির সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আইসিটি প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য প্রকৌশল ডিগ্রি বাধ্যতামূলক হওয়ায় বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৫০ জন প্রভাষক বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আইসিটি প্রভাষকের ২৫টি পদের বিপরীতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জন আবেদন করেন, যা প্রমাণ করে যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই।

মাধ্যমিক পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি; এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি। মাউশি সম্প্রতি ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে এক পালায় পরিচালিত ৫৩২টি বিদ্যালয়ে একটি করে এবং দুই পালায় পরিচালিত ১৭০টি বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।

ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী রয়েছে, অথচ সেখানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন এবং বেসরকারি বেতনে দুজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার পাঠদানে যুক্ত আছেন। নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারিভাবে আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন। নেত্রকোনা সরকারি কলেজেও একই চিত্র, সেখানে ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারিভাবে আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংকট অনেকটাই দূর হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, দ্রুত আইসিটি-সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংকট দূর না করলে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি কমানো কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যা ডিজিটাল অগ্রগতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রেখেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সালমান শাহ হত্যা মামলা: ডনের জামিন আবেদন নাকচ করল আদালত

১৩ বছর পরও আইসিটি শিক্ষকহীন অনেক সরকারি কলেজ ও বিদ্যালয়

প্রকাশিত হয়েছে: ০৫:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ১৩ বছর আগে। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও অনেক সরকারি কলেজে নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক নেই। এমনকি দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর একটিতেও এই বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে আইসিটি বাধ্যতামূলক করার পর থেকে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত অংশ নিলেও, শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকায় শুরু থেকেই সংকট রয়ে গেছে।

শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা বা অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকেরা আইসিটির ক্লাস নিচ্ছেন। কোথাও আবার প্রোগ্রামার, অতিথি বা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা ঘুরেফিরে এই বিষয়টি পড়ান। জনবল সংকটের কারণে আইসিটির ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হয় না বলে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের বদলে কেবল পরীক্ষামুখী পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

বর্তমানে দেশে সরকারি কলেজ রয়েছে ৭০৮টি, যার মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল পর্যন্ত সরকারি হওয়া পুরোনো কলেজগুলোর মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি। তবে ১৭টিতে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষকের পদ রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া ৩৬৩টি কলেজের মধ্যে ১০২টিতেও কোনো পদ নেই। ২০১৬ সালে সরকারি কলেজে ২৫৫টি এবং পরবর্তীতে আরও ১৮টি ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত ধীর। ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক যোগ দেন, যাদের মধ্যে বর্তমানে ১৩২ জন কর্মরত আছেন।

প্রশাসনিক সংস্কারসংক্রান্ত এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিষয়ে অন্তত একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক ও দুজন প্রভাষকের পদ থাকার কথা থাকলেও আইসিটির ক্ষেত্রে অধিকাংশ কলেজে সেই কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সর্বশেষ ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে সুপারিশ করা হলেও তাঁদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া ৫১টি সরকারি কলেজে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত ২৯১টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে, ফলে পদোন্নতির সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আইসিটি প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য প্রকৌশল ডিগ্রি বাধ্যতামূলক হওয়ায় বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৫০ জন প্রভাষক বুয়েট, কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আইসিটি প্রভাষকের ২৫টি পদের বিপরীতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জন আবেদন করেন, যা প্রমাণ করে যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই।

মাধ্যমিক পর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি; এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি। মাউশি সম্প্রতি ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে এক পালায় পরিচালিত ৫৩২টি বিদ্যালয়ে একটি করে এবং দুই পালায় পরিচালিত ১৭০টি বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।

ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী রয়েছে, অথচ সেখানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন এবং বেসরকারি বেতনে দুজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার পাঠদানে যুক্ত আছেন। নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারিভাবে আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন। নেত্রকোনা সরকারি কলেজেও একই চিত্র, সেখানে ২ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারিভাবে আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংকট অনেকটাই দূর হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, দ্রুত আইসিটি-সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংকট দূর না করলে ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি কমানো কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যা ডিজিটাল অগ্রগতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রেখেছে।