লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে কোণঠাসা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে তেহরানের বিভিন্ন নিশানায় হামলা চালায়। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য ইরানি নেতা নিহত হন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে যৌথ হামলা চালানো, যা এই যুদ্ধের মাধ্যমে পূরণ হয়। তবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের সরকারের প্রতি ট্রাম্পের মূল সমালোচনা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন, যা এখন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতি ধুঁকতে থাকলেও তা ইরান সরকারের পতনের কোনো কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল জ্বালানি তেলের দামই ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা ট্রাম্পের জন্য মার্কিন নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শিবলী তেলহামি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের ফলে আর্থিক ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন আমেরিকানও এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন না।

ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প একে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করলেও, তেহরানের সরকার এখনো টিকে আছে। কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইরানের কাছে এখনো উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং তারা হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে ভৌগোলিক অবস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এছাড়া হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সহযোগী শক্তিগুলো দুর্বল হলেও এখনো টিকে আছে। মিলার মনে করেন, ভবিষ্যতে অন্য কোনো মার্কিন প্রশাসন আর এমন সামরিক অভিযানের কথা ভাববে না।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতানিয়াহু বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন। বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, গাজা ও লেবাননের পর ইরানেও নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন এবং অনেক ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় ভুল বলে মনে করছেন। সাবেক উপদেষ্টা দানিয়েল লেভি জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন এই যুদ্ধ তার নির্বাচনী প্রচারণায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কিন্তু তা এখন তার ব্যর্থতার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

ইরানের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত এই যুদ্ধে তাদের অর্থনীতিতে ১৪৫ বিলিয়ন (১৪ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। শুধু মার্কিন অবরোধের কারণেই দেশটির প্রতিদিন গড়ে ৪৩৫ মিলিয়ন (৪৩ কোটি ৫০ লাখ) ডলার ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া ২৭টি ভিন্ন খাতে প্রভাব এবং ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অচল হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে বড় ধস নেমেছে। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান সরকার টিকে থাকার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। ইরান বিষয়ক শিক্ষাবিদ শারভিন মালেকজাদেহ বলছেন, সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামই ইরানকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করছে। সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধ কোনো পক্ষকেই চূড়ান্ত বিজয় এনে দেয়নি, বরং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়কেই নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউক্রেনকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার সামরিক সহায়তা দেবে ইউরোপীয় কমিশন

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে কোণঠাসা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০১:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬

ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে তেহরানের বিভিন্ন নিশানায় হামলা চালায়। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য ইরানি নেতা নিহত হন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানে যৌথ হামলা চালানো, যা এই যুদ্ধের মাধ্যমে পূরণ হয়। তবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি বলেই মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে জো বাইডেনের সরকারের প্রতি ট্রাম্পের মূল সমালোচনা ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা ধ্বংসের দাবি করেছিলেন, যা এখন মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের ফলে ইরানের অর্থনীতি ধুঁকতে থাকলেও তা ইরান সরকারের পতনের কোনো কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল জ্বালানি তেলের দামই ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা ট্রাম্পের জন্য মার্কিন নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শিবলী তেলহামি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের ফলে আর্থিক ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন আমেরিকানও এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন না।

ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প একে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করলেও, তেহরানের সরকার এখনো টিকে আছে। কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ইরানের কাছে এখনো উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে এবং তারা হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে ভৌগোলিক অবস্থানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এছাড়া হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সহযোগী শক্তিগুলো দুর্বল হলেও এখনো টিকে আছে। মিলার মনে করেন, ভবিষ্যতে অন্য কোনো মার্কিন প্রশাসন আর এমন সামরিক অভিযানের কথা ভাববে না।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতানিয়াহু বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন। বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, গাজা ও লেবাননের পর ইরানেও নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন এবং অনেক ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় ভুল বলে মনে করছেন। সাবেক উপদেষ্টা দানিয়েল লেভি জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু আশা করেছিলেন এই যুদ্ধ তার নির্বাচনী প্রচারণায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কিন্তু তা এখন তার ব্যর্থতার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

ইরানের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিল পর্যন্ত এই যুদ্ধে তাদের অর্থনীতিতে ১৪৫ বিলিয়ন (১৪ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। শুধু মার্কিন অবরোধের কারণেই দেশটির প্রতিদিন গড়ে ৪৩৫ মিলিয়ন (৪৩ কোটি ৫০ লাখ) ডলার ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া ২৭টি ভিন্ন খাতে প্রভাব এবং ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অচল হয়ে পড়ায় অর্থনীতিতে বড় ধস নেমেছে। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান সরকার টিকে থাকার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। ইরান বিষয়ক শিক্ষাবিদ শারভিন মালেকজাদেহ বলছেন, সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামই ইরানকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করছে। সব মিলিয়ে, এই যুদ্ধ কোনো পক্ষকেই চূড়ান্ত বিজয় এনে দেয়নি, বরং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়কেই নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।