লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খ্যাতি বা টাকার জন্য নয়, লিখতে হবে মনের টানে: ‘লেখক বন্ধু উৎসব’

লেখালেখি কেবল শব্দ সাজানোর খেলা নয়, বরং এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে গভীর জীবনবোধ, পাঠ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’-এ তরুণ লেখকদের প্রতি এমন আহ্বান জানিয়েছেন দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক, কবি, সম্পাদক ও প্রকাশকেরা। ভালো লেখার জন্য প্রচুর পড়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল হওয়া এবং নিজের লেখাকে বারবার পাঠকের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসবে সারা দেশ থেকে নির্বাচিত ‘লেখক বন্ধু’রা অংশ নেন। উৎসবের আয়োজন সহযোগী হিসেবে ছিল মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। তরুণ লেখকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিকাশের মহাব্যবস্থাপক (কমিউনিকেশন) রুখসানা মিলি বলেন, লেখালেখির কৌশল শেখার এই সুযোগ তরুণদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান একটি প্রাপ্তি।

উৎসবের বিভিন্ন সেশনে লেখালেখির নানা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ‘ভ্রমণ ও অনুবাদ’ বিষয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন। তিনি বলেন, অনুবাদককে অবশ্যই সৃষ্টিশীল হতে হবে। যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে, সেই দেশের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে ভালো অনুবাদ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভ্রমণকাহিনিতে সেখানকার মানুষের চরিত্র, ইতিহাস ও জীবনযাপন ফুটিয়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।

কবিতা নিয়ে কথা বলেন কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তাঁর মতে, কেবল অনুভূতির প্রকাশই কবিতা নয়; অনুভূতিকে ভাষার মাধ্যমে সর্বজনীন রূপ দিতে পারলেই তা কবিতা হয়ে ওঠে। প্রবন্ধে ব্যবহৃত শব্দ কবিতায় এসে ভিন্ন অর্থ ধারণ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র আমাদের নতুন এক পৃথিবীর সন্ধান দেয়।

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল লেখকদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, লেখক, পাঠ্য ও পাঠকের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সাহিত্য একটি শিল্পে রূপ নেয়। লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকদের আলাপচারিতা পর্বে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ তরুণ লেখকদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বই প্রকাশের প্রস্তুতিতে তাড়াহুড়ো করা যাবে না এবং লেখায় কঠিন শব্দ এড়িয়ে চলতে হবে। বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ জানান, প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানোর সময় সূচিপত্র, পৃষ্ঠা নম্বর, ভূমিকা, লেখক পরিচিতি ও বইটির সারসংক্ষেপসহ সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি পাঠানো উচিত।

ফিচার ও সংবাদ প্রসঙ্গে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ফিচার হলো সাংবাদিকতারই একটি অংশ, যা বাস্তব জীবনের তথ্য দিয়ে সাহিত্যিক ঢঙে লিখতে হয়। এর জন্য আকর্ষণীয় শিরোনাম ও নতুন তথ্য জরুরি।

লেখক জীবনের লড়াই ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, "বলিয়া লিখিয়া যদি দেশের মানুষের উপকার করিতে পারো, সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারো, তাহলে লেখো।" তিনি আরও বলেন, শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া, আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই শিল্পী গড়ে ওঠে। খ্যাতি বা টাকার জন্য না লিখে মনের টানে লেখার পরামর্শ দেন তিনি।

কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন জানান, লেখার কোনো নির্দিষ্ট সর্বজনীন সূত্র নেই, এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পড়া, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা। বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক তরুণ লেখকদের প্রতি তাঁর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উৎসবের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা উত্তম রায়, সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ ও রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা মুহসিনা বুশরা, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ ইমাম এবং কার্যনির্বাহী সদস্য তাপসী রায়।

উৎসবের সমাপনী পর্বে ২০২৫-২৬ সালের সেরা লেখার জন্য ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার ২০২৬’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—ভৈরব বন্ধুসভার আফিফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বন্ধুসভার মো. আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার খোন্দকার হুমায়ূন কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার নুসরাত রুষা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার জাসেদুল ইসলাম।

এছাড়া লেখালেখি কর্মশালায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া পাঁচজন—বদরুল হাসান, সাব্বির আহমেদ, তাসফিয়া তাসমিন, নুসরাত ভূঁইয়া ও শহীদুল আলম এবং চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় সেরা তিন বিজয়ী শারমিন সুলতানা, ভূঁইয়া শফি ও তাজিন সুরভী পুরস্কার লাভ করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

খ্যাতি বা টাকার জন্য নয়, লিখতে হবে মনের টানে: ‘লেখক বন্ধু উৎসব’

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩৪:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

লেখালেখি কেবল শব্দ সাজানোর খেলা নয়, বরং এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে গভীর জীবনবোধ, পাঠ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’-এ তরুণ লেখকদের প্রতি এমন আহ্বান জানিয়েছেন দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক, কবি, সম্পাদক ও প্রকাশকেরা। ভালো লেখার জন্য প্রচুর পড়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল হওয়া এবং নিজের লেখাকে বারবার পাঠকের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসবে সারা দেশ থেকে নির্বাচিত ‘লেখক বন্ধু’রা অংশ নেন। উৎসবের আয়োজন সহযোগী হিসেবে ছিল মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। তরুণ লেখকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিকাশের মহাব্যবস্থাপক (কমিউনিকেশন) রুখসানা মিলি বলেন, লেখালেখির কৌশল শেখার এই সুযোগ তরুণদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান একটি প্রাপ্তি।

উৎসবের বিভিন্ন সেশনে লেখালেখির নানা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ‘ভ্রমণ ও অনুবাদ’ বিষয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন। তিনি বলেন, অনুবাদককে অবশ্যই সৃষ্টিশীল হতে হবে। যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হচ্ছে, সেই দেশের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে ভালো অনুবাদ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভ্রমণকাহিনিতে সেখানকার মানুষের চরিত্র, ইতিহাস ও জীবনযাপন ফুটিয়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।

কবিতা নিয়ে কথা বলেন কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তাঁর মতে, কেবল অনুভূতির প্রকাশই কবিতা নয়; অনুভূতিকে ভাষার মাধ্যমে সর্বজনীন রূপ দিতে পারলেই তা কবিতা হয়ে ওঠে। প্রবন্ধে ব্যবহৃত শব্দ কবিতায় এসে ভিন্ন অর্থ ধারণ করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র আমাদের নতুন এক পৃথিবীর সন্ধান দেয়।

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল লেখকদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, লেখক, পাঠ্য ও পাঠকের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সাহিত্য একটি শিল্পে রূপ নেয়। লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকদের আলাপচারিতা পর্বে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ তরুণ লেখকদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, বই প্রকাশের প্রস্তুতিতে তাড়াহুড়ো করা যাবে না এবং লেখায় কঠিন শব্দ এড়িয়ে চলতে হবে। বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী জাফর আহমদ রাশেদ জানান, প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানোর সময় সূচিপত্র, পৃষ্ঠা নম্বর, ভূমিকা, লেখক পরিচিতি ও বইটির সারসংক্ষেপসহ সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি পাঠানো উচিত।

ফিচার ও সংবাদ প্রসঙ্গে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ফিচার হলো সাংবাদিকতারই একটি অংশ, যা বাস্তব জীবনের তথ্য দিয়ে সাহিত্যিক ঢঙে লিখতে হয়। এর জন্য আকর্ষণীয় শিরোনাম ও নতুন তথ্য জরুরি।

লেখক জীবনের লড়াই ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, "বলিয়া লিখিয়া যদি দেশের মানুষের উপকার করিতে পারো, সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারো, তাহলে লেখো।" তিনি আরও বলেন, শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া, আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই শিল্পী গড়ে ওঠে। খ্যাতি বা টাকার জন্য না লিখে মনের টানে লেখার পরামর্শ দেন তিনি।

কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন জানান, লেখার কোনো নির্দিষ্ট সর্বজনীন সূত্র নেই, এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর পড়া, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা। বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক তরুণ লেখকদের প্রতি তাঁর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উৎসবের আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা উত্তম রায়, সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ ও রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা মুহসিনা বুশরা, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ ইমাম এবং কার্যনির্বাহী সদস্য তাপসী রায়।

উৎসবের সমাপনী পর্বে ২০২৫-২৬ সালের সেরা লেখার জন্য ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার ২০২৬’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—ভৈরব বন্ধুসভার আফিফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বন্ধুসভার মো. আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার খোন্দকার হুমায়ূন কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার নুসরাত রুষা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার জাসেদুল ইসলাম।

এছাড়া লেখালেখি কর্মশালায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া পাঁচজন—বদরুল হাসান, সাব্বির আহমেদ, তাসফিয়া তাসমিন, নুসরাত ভূঁইয়া ও শহীদুল আলম এবং চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় সেরা তিন বিজয়ী শারমিন সুলতানা, ভূঁইয়া শফি ও তাজিন সুরভী পুরস্কার লাভ করেন।