লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাটমোহরে হারিকেন ও চাঁদের আলোয় ঐতিহ্যবাহী পুথি পাঠের আসর

আধুনিক আলোকসজ্জা আর ঝলমলে আয়োজনের ভিড়ে যেন এক টুকরো স্মৃতির অ্যালবাম হয়ে ফুটে উঠল এক মায়াবী রাত। কৃত্রিম আলোর ঝিকমিক নয়, ওপরের মুক্ত আকাশজুড়ে জ্যোৎস্নার ধবল আলো আর নিচে মাটিতে নিভু নিভু কুপিবাতি ও হারিকেনের আলোয় জমে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী এক আসর। চাঁদের আলো আর হারিকেনের সেই আবছায়াতে লোকসংগীতের গায়েন তাঁর কণ্ঠের জাদুতে উপস্থিত শ্রোতাদের ভাসালেন সুরের ভেলায়। দেখে মনে হলো এক মুহূর্তে আবারও ১৭ শতকে ফিরে গেছে সবাই। ইট-কাঠের যান্ত্রিক ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ ও আমেজ ফিরিয়ে আনাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

আসরের পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলা হয় বৈদ্যুতিক আলো ও চাকচিক্য। চটের চাদর আর মাদুর বিছানো প্রাঙ্গণে জ্বলছিল কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী কুপি ও হারিকেন, আর ওপর থেকে আলো ঢালছিল রুপালি চাঁদ। এমন এক অলৌকিক স্নিগ্ধ পরিবেশে যখন গায়েন তার মায়াবী কণ্ঠ নিয়ে আসরে উঠলেন, মুহূর্তেই চারপাশ যেন হয়ে উঠলো কোলাহল মুক্ত। তারপর একে একে পরিবেশন করলেন একসময়ের জনপ্রিয় কাব্য বিবি সোনাভান এবং গাজীকালু চম্পাবতীর পুথি পাঠ।

এ বিষয়ে দোলং গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (২০) জানান, আগে কখনও এগুলো দেখেন বা শোনেননি তিনি। দেয়ালে পোস্টার ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে পুথি পাঠ দেখার আগ্রহ জাগে। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে এসেও হারিকেন ও চাঁদের আলোয় গল্প শুনতে বেশ ভালো লেগেছে তার। রামনগর এলাকার বাসিন্দা জুয়েল (৩০) জানান, আগে বই বা নানা-নানির কাছে পুথি পাঠের গল্প শুনেছি। কিন্তু কীভাবে পুথি পড়ে এবার তা বাস্তবে দেখলাম ও শুনলাম। বাঙালি সংস্কৃতিকে তরুণ প্রজন্মকে জানাতে এমন আয়োজন আরও করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। সোনাহার এলাকার মাছুমা (১৮) জানান, আগে বইয়ের মধ্যে পুথি পড়ার ছবি দেখেছি। কিন্তু এবার নিজ চোখে তা দেখতে পেয়ে অনেক ভালো লেগেছে তার। তিনি বলেন, মহীয়সী নারী বিবি সোনাভানের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাই বারবার এমন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, পুথি পাঠ আমাদের বাঙালির ঐতিহ্যর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলার মানুষ যে এখনও তাদের আদি সংস্কৃতি ভুলে নাই এই আয়োজন তার প্রমাণ। বিলচলন ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এসব লোকজ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মানুষের মনে আজীবন বেঁচে থাকবে। প্রযুক্তির ভিড়ে বাঙালি যে তার আদি সংস্কৃতির বর্ণিল সোনালি অতীতে ফিরে এসেছে, এটা দেখে তার অনেক ভালো লেগেছে।

পুথি পাঠের আয়োজক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. এস. এম আতিকুল আলম বলেন, এই সাহিত্যটি সতেরো-আঠারো শতকের দিকে শুরু হলেও আশি-নব্বই দশকের দিকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। তরুণদের মাঝে আদি সংস্কৃতি তুলে ধরতেই তিনি এ ধরনের উদ্যােগ নিয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

খ্যাতি বা টাকার জন্য নয়, লিখতে হবে মনের টানে: ‘লেখক বন্ধু উৎসব’

চাটমোহরে হারিকেন ও চাঁদের আলোয় ঐতিহ্যবাহী পুথি পাঠের আসর

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩১:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

আধুনিক আলোকসজ্জা আর ঝলমলে আয়োজনের ভিড়ে যেন এক টুকরো স্মৃতির অ্যালবাম হয়ে ফুটে উঠল এক মায়াবী রাত। কৃত্রিম আলোর ঝিকমিক নয়, ওপরের মুক্ত আকাশজুড়ে জ্যোৎস্নার ধবল আলো আর নিচে মাটিতে নিভু নিভু কুপিবাতি ও হারিকেনের আলোয় জমে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী এক আসর। চাঁদের আলো আর হারিকেনের সেই আবছায়াতে লোকসংগীতের গায়েন তাঁর কণ্ঠের জাদুতে উপস্থিত শ্রোতাদের ভাসালেন সুরের ভেলায়। দেখে মনে হলো এক মুহূর্তে আবারও ১৭ শতকে ফিরে গেছে সবাই। ইট-কাঠের যান্ত্রিক ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ ও আমেজ ফিরিয়ে আনাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

আসরের পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলা হয় বৈদ্যুতিক আলো ও চাকচিক্য। চটের চাদর আর মাদুর বিছানো প্রাঙ্গণে জ্বলছিল কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী কুপি ও হারিকেন, আর ওপর থেকে আলো ঢালছিল রুপালি চাঁদ। এমন এক অলৌকিক স্নিগ্ধ পরিবেশে যখন গায়েন তার মায়াবী কণ্ঠ নিয়ে আসরে উঠলেন, মুহূর্তেই চারপাশ যেন হয়ে উঠলো কোলাহল মুক্ত। তারপর একে একে পরিবেশন করলেন একসময়ের জনপ্রিয় কাব্য বিবি সোনাভান এবং গাজীকালু চম্পাবতীর পুথি পাঠ।

এ বিষয়ে দোলং গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (২০) জানান, আগে কখনও এগুলো দেখেন বা শোনেননি তিনি। দেয়ালে পোস্টার ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে পুথি পাঠ দেখার আগ্রহ জাগে। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগে এসেও হারিকেন ও চাঁদের আলোয় গল্প শুনতে বেশ ভালো লেগেছে তার। রামনগর এলাকার বাসিন্দা জুয়েল (৩০) জানান, আগে বই বা নানা-নানির কাছে পুথি পাঠের গল্প শুনেছি। কিন্তু কীভাবে পুথি পড়ে এবার তা বাস্তবে দেখলাম ও শুনলাম। বাঙালি সংস্কৃতিকে তরুণ প্রজন্মকে জানাতে এমন আয়োজন আরও করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। সোনাহার এলাকার মাছুমা (১৮) জানান, আগে বইয়ের মধ্যে পুথি পড়ার ছবি দেখেছি। কিন্তু এবার নিজ চোখে তা দেখতে পেয়ে অনেক ভালো লেগেছে তার। তিনি বলেন, মহীয়সী নারী বিবি সোনাভানের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাই বারবার এমন আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবুল কাশেম বলেন, পুথি পাঠ আমাদের বাঙালির ঐতিহ্যর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলার মানুষ যে এখনও তাদের আদি সংস্কৃতি ভুলে নাই এই আয়োজন তার প্রমাণ। বিলচলন ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এসব লোকজ সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মানুষের মনে আজীবন বেঁচে থাকবে। প্রযুক্তির ভিড়ে বাঙালি যে তার আদি সংস্কৃতির বর্ণিল সোনালি অতীতে ফিরে এসেছে, এটা দেখে তার অনেক ভালো লেগেছে।

পুথি পাঠের আয়োজক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. এস. এম আতিকুল আলম বলেন, এই সাহিত্যটি সতেরো-আঠারো শতকের দিকে শুরু হলেও আশি-নব্বই দশকের দিকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। তরুণদের মাঝে আদি সংস্কৃতি তুলে ধরতেই তিনি এ ধরনের উদ্যােগ নিয়েছেন।