লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানিহীন রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র: সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা গচ্চার দায় কার?

জ্বালানি সরবরাহের কোনো সুনিশ্চিত ব্যবস্থা ছাড়াই নির্মিত ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও, বর্তমানে এটি সচল করার কোনো কার্যকর উপায় খুঁজে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিচারপতি মইনুল কমিশন এই প্রকল্পটিকে রাষ্ট্রের অর্থ গচ্ছার একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করে এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর খুলনার রূপসায় ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্ লিমিটেডের পরিত্যক্ত আবাসিক এলাকা থেকে জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট হাসিনার বিশেষ নির্দেশে প্রকল্পটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়। একই বছরের ২ নভেম্বর পরিকল্পনা কমিশন পিডিপিপি অনুমোদন দেয়। মূলত ২০১৩ সালে ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এইচ এনার্জির কাছ থেকে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ সরকার এ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নওপাজেকো এইচ এনার্জির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। তবে পাইপলাইন স্থাপনের বিরোধ সালিশে গড়ালে ভারত থেকে জ্বালানি পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা না করেই আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৯ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে তোলে। ২০২২ সালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটিকে স্বৈরাচার হাসিনার ব্যক্তিগত অভিলাসের প্রকল্প উল্লেখ করে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, ভারত থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি। পেট্রোবাংলা ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয় এবং পরবর্তীতে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে নওপাজেকো পাইপলাইন নির্মাণের সমঝোতা স্মারক সই করে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২২ মে একনেক রূপসার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ২৪৬১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৫৯৮৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ২ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগ এডিবির সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) যৌথভাবে এ প্রকল্পে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (নওপাজেকো) এখন এই বিশাল ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপে রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস পাওয়ার আশায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের চিন্তা করছে, তবে নতুন করে গ্যাস উৎপাদন না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া অসম্ভব বলেই মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। কর্মকর্তাদের মতে, উৎপাদনে যাওয়ার আগেই এ বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থাপিত যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে এবং গ্যারান্টি পিরিয়ডেরও পুরো সময় পার হয়ে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাইয়ের ২৭ দিনে আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয়

জ্বালানিহীন রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র: সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা গচ্চার দায় কার?

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:১৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

জ্বালানি সরবরাহের কোনো সুনিশ্চিত ব্যবস্থা ছাড়াই নির্মিত ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও, বর্তমানে এটি সচল করার কোনো কার্যকর উপায় খুঁজে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিচারপতি মইনুল কমিশন এই প্রকল্পটিকে রাষ্ট্রের অর্থ গচ্ছার একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করে এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর খুলনার রূপসায় ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্ লিমিটেডের পরিত্যক্ত আবাসিক এলাকা থেকে জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট হাসিনার বিশেষ নির্দেশে প্রকল্পটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়। একই বছরের ২ নভেম্বর পরিকল্পনা কমিশন পিডিপিপি অনুমোদন দেয়। মূলত ২০১৩ সালে ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এইচ এনার্জির কাছ থেকে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ সরকার এ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নওপাজেকো এইচ এনার্জির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। তবে পাইপলাইন স্থাপনের বিরোধ সালিশে গড়ালে ভারত থেকে জ্বালানি পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা না করেই আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৯ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে তোলে। ২০২২ সালে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটিকে স্বৈরাচার হাসিনার ব্যক্তিগত অভিলাসের প্রকল্প উল্লেখ করে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান, ভারত থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি। পেট্রোবাংলা ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয় এবং পরবর্তীতে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে নওপাজেকো পাইপলাইন নির্মাণের সমঝোতা স্মারক সই করে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২২ মে একনেক রূপসার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ২৪৬১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৫৯৮৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ২ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগ এডিবির সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) যৌথভাবে এ প্রকল্পে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (নওপাজেকো) এখন এই বিশাল ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপে রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস পাওয়ার আশায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের চিন্তা করছে, তবে নতুন করে গ্যাস উৎপাদন না হওয়া পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া অসম্ভব বলেই মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। কর্মকর্তাদের মতে, উৎপাদনে যাওয়ার আগেই এ বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থাপিত যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে এবং গ্যারান্টি পিরিয়ডেরও পুরো সময় পার হয়ে গেছে।