লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অম্লমধুর হিসাব

বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের পথচলার হিসাবটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ দেখছেন ‘অম্লমধুর’ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সাদামাটা জীবনযাপন ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও তাঁর মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের মন্থর গতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ নানা খাতের ধারাবাহিক সংকট জনমনে কিছুটা হতাশা তৈরি করেছে।

সরকারের এই ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট বাদ দিলে তিনি সরকারকে ১০০-তে ৫০ দেবেন। তাঁর মতে, নীরব চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারা সরকারের বড় নেতিবাচক দিক। তবে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ছয় মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে কাজের গতি আরও বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান নিজের প্রটোকল ও সরকারি ব্যয় কমিয়ে গুলশানের ব্যক্তিগত বাসভবনেই থাকছেন। নিজের প্রটোকলের গাড়ি বহর ছোট করে দিয়েছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রটোকল বাতিল করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কখনো কখনো নিজেই গাড়ি চালিয়ে কর্মস্থলে বা সরকারি অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল অনুসরণ করছেন। সড়কে চলতে প্রধানমন্ত্রী বাড়তি কোনো সুবিধা নিচ্ছেন না। তবে তাঁর এই নিরন্তর ছুটে চলার সঙ্গে মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য তাল মেলাতে পারছেন না বলে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের আমলাতান্ত্রিক অনিয়ম এখনো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর এক নজিরবিহীন অবস্থায় পড়ে দেশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেও পুরো পারেনি। বিএনপি সরকারের সামনে এটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এখনো বাহিনীগুলোর মনোবল পুরো ফিরেনি। একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা, সার সংকট এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়নে তৃণমূলের দলীয় নেতাকর্মীদের নানা অনিয়ম ও হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এত সংকটের মধ্যেও সরকারের কিছু বড় অর্জন রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার ২১ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, কৃষকদের ঋণ মওকুফ ও কৃষক কার্ড চালুর মতো জনবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগে গতি এনে শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া, দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিকে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় সংসদে ‘জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ এবং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিধান রেখে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়েছে। ঢাকার যানজট নিরসনে এআই প্রযুক্তির ট্রাফিক ব্যবস্থা, ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার মতো বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষায় দেশ জুড়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বেশকিছু জনবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার, এর মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টার্ট-আপ ও আইডিয়া কম্পিটিশন শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করেছে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন এবং রাজপথে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি সরকারের জন্য আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাঙ্গার গেমসে ফিরছেন জেনিফার লরেন্স, ভক্তদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ

তারেক রহমান সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অম্লমধুর হিসাব

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৪৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করা এই সরকারের পথচলার হিসাবটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ দেখছেন ‘অম্লমধুর’ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সাদামাটা জীবনযাপন ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও তাঁর মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যের মন্থর গতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ নানা খাতের ধারাবাহিক সংকট জনমনে কিছুটা হতাশা তৈরি করেছে।

সরকারের এই ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট বাদ দিলে তিনি সরকারকে ১০০-তে ৫০ দেবেন। তাঁর মতে, নীরব চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারা সরকারের বড় নেতিবাচক দিক। তবে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ছয় মাসে বিএনপি সরকারের অধিকাংশ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে কাজের গতি আরও বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান নিজের প্রটোকল ও সরকারি ব্যয় কমিয়ে গুলশানের ব্যক্তিগত বাসভবনেই থাকছেন। নিজের প্রটোকলের গাড়ি বহর ছোট করে দিয়েছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের প্রটোকল বাতিল করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কখনো কখনো নিজেই গাড়ি চালিয়ে কর্মস্থলে বা সরকারি অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যাল অনুসরণ করছেন। সড়কে চলতে প্রধানমন্ত্রী বাড়তি কোনো সুবিধা নিচ্ছেন না। তবে তাঁর এই নিরন্তর ছুটে চলার সঙ্গে মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য তাল মেলাতে পারছেন না বলে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের আমলাতান্ত্রিক অনিয়ম এখনো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর এক নজিরবিহীন অবস্থায় পড়ে দেশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেও পুরো পারেনি। বিএনপি সরকারের সামনে এটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এখনো বাহিনীগুলোর মনোবল পুরো ফিরেনি। একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা, সার সংকট এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়নে তৃণমূলের দলীয় নেতাকর্মীদের নানা অনিয়ম ও হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এত সংকটের মধ্যেও সরকারের কিছু বড় অর্জন রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার ২১ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, কৃষকদের ঋণ মওকুফ ও কৃষক কার্ড চালুর মতো জনবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগে গতি এনে শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া, দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিকে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।

জাতীয় সংসদে ‘জুলাইযোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ এবং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিধান রেখে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়েছে। ঢাকার যানজট নিরসনে এআই প্রযুক্তির ট্রাফিক ব্যবস্থা, ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার মতো বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এছাড়া পরিবেশ সুরক্ষায় দেশ জুড়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বেশকিছু জনবান্ধব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার, এর মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টার্ট-আপ ও আইডিয়া কম্পিটিশন শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করেছে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন এবং রাজপথে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি সরকারের জন্য আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।