লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুপার এল নিনো আসছে: বাংলাদেশ কি অস্বাভাবিক গরমের জন্য প্রস্তুত?

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যভাগ থেকে পৃথিবী দেড় শ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র এল নিনো চক্রের মুখোমুখি হতে পারে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে আগস্ট মাস থেকে শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য, এটি নিছক আবহাওয়ার খামখেয়ালি নয়, বরং একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ভূগোল, দারিদ্র্য এবং শক্তি-ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যার জন্য দেশটি এখনো প্রস্তুত নয়।

এল নিনো কেবল উষ্ণতা বৃদ্ধিই নয়, এটি একটি সিস্টেম ফেইলিউরের কারণ হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা এল নিনোর মূল কারণ। এর ফলে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে বৃষ্টিপাত কমতে পারে, কৃষিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মডেল অনুযায়ী, এল নিনোর বছরে আমন ধানের ফলন ৮-১২ শতাংশ কমে যেতে পারে। ২০১৫-১৬ সালে বাংলাদেশে ২.৪ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব মতে, তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে শ্রমিকের কাজের ক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে, ২০২৬ সালে শুধু পোশাক ও নির্মাণ খাতে জিডিপির ক্ষতি প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। গ্রীষ্মকালে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০-৪০ শতাংশ কেবল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও ফ্যানের জন্য ব্যয় হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সুপার এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি বাড়লে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোড যুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়লে হিটস্ট্রোকের প্রকোপ ১২ শতাংশ এবং ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত মৃত্যু ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে দেশের প্রায় ৫০ লাখ টিনের বাড়ি চুলায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কিছু সমাধান এখনই শুরু করা যেতে পারে। প্রাচীন ইরানের ‘বাদগির’ এবং রোমানদের ‘সৌরচিমনি’-এর মতো বায়ু-গ্রাহক ও সৌরচিমনি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণে কার্যকর হতে পারে। আধুনিক সংকর নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সৌরশক্তিচালিত এবং কোনো শীতলীকরণ গ্যাস ব্যবহার করে না। যুক্তরাজ্যের ডি মন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স বিল্ডিং এই নীতিতে নির্মিত একটি উদাহরণ। টিনশেড ঘরে বিদ্যুৎ ছাড়াই গরম বাতাস বের করার জন্য টারবাইন ভেন্টিলেটর বা তুফান টুপি ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভূতাপীয় বা মাটির বায়ু-টানেল প্রযুক্তিও একটি কার্যকর সমাধান। ভূপৃষ্ঠ থেকে চার মিটার নিচে সারা বছর মাটির তাপমাত্রা ২৫-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্থির থাকে। পিরোজপুরে জি ল্যাবের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাইরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘরের ভেতরে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে মাত্র দুটি ৫০ ওয়াটের ফ্যান ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তুলনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় ৭৫-৮০ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় শূন্য।

প্রতিফলিত ছাদ বা শীতল ছাদ তাপ কমাতে সহায়ক। তীব্র গরমে একটি সাধারণ টিনের ছাদ ৬০-৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে। সাদা প্রতিফলিত রং সেই তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি কমাতে পারে। ঢাকার করাইল বস্তিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গরমের সময় ঘরের ভেতর ৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কমানো সম্ভব হয়েছে। আহমেদাবাদে এই কর্মসূচি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ১০০ জনের প্রাণ বাঁচাচ্ছে। ব্র্যাক বা গ্রামীণ ব্যাংক ৫-১০ হাজার টাকার শীতলীকরণ ঋণ দিলে গরিব পরিবারগুলো বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় থেকেই তা পরিশোধ করতে পারবে।

বাঁশ, খড়, পাট ও মাটির মতো তাপ-অন্তরক উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। টিনের চালের ওপর বাঁশের মাচা বা খড়ের আবরণ একটি বায়ুস্তর তৈরি করে ছাদের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি পর্যন্ত কমাতে পারে। পাটখড়ি টিনের নিচে বিছালেও একই কাজ হয়। মাটির ইটের দেয়াল ও মেঝে দিনে তাপ শোষণ করে রাতে ছেড়ে দেয়, ফলে দিনের বেলা ঘরের ভেতর অনেক ঠান্ডা থাকে। ভিয়েতনামে বাঁশ ও পাটের চট দিয়ে নির্মিত পরিবেশবান্ধব টিনশেডে বাইরের চেয়ে ৬ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। মশরবিয়া বা বাঁশের জালি পর্দা সূর্যের আলো ছেঁকে ঘরে ঢোকার সময় বাতাস চলাচল বজায় রাখে, যা ঘরের তাপমাত্রা ৩-৫ ডিগ্রি কমাতে পারে।

নগর তাপ দ্বীপ প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ করিডর, জলাধার ও শীতল রাস্তা নির্মাণ জরুরি। ঢাকার অনেক এলাকায় কংক্রিট ও পিচের কারণে আশপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৪-৭ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় মাত্র ১০ শতাংশ সবুজায়ন শহরের গড় তাপমাত্রা ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে পারে। কলম্বিয়ার মেদেলিন শহর ৩০টি সবুজ করিডর তৈরি করে তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি কমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সে প্রতিফলিত শীতল রাস্তার আবরণ ব্যবহার করে রাস্তার তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি কমানো হয়েছে। একটি মাঝারি পুকুরও আশপাশের পরিবেশ কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা রাখতে পারে, অথচ নগরায়ণের চাপে হাজার হাজার পুকুর ভরাট হচ্ছে।

মাটির পাত্রের ফ্রিজ ও পানির কুয়াশা ব্যবস্থা তাপ কমাতে কার্যকর। মাটির দুটো পাত্রের মাঝে ভেজা বালু দিলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ভেতরের তাপমাত্রা ১০-১৫ ডিগ্রি কমে যায়, যা মাত্র ৩০০-৫০০ টাকায় সম্ভব। নাইজেরিয়া ও সুদানে এটি বিদ্যুৎ ছাড়া ইনসুলিন ও সবজি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পানির কুয়াশা ছিটালে তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি কমানো সম্ভব। স্পেনের সেভিলে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জলপ্রণালি ও আধুনিক পানির কুয়াশা একত্রে ব্যবহার করে রাস্তার তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি কমানো হয়েছে।

দশা-পরিবর্তনকারী উপাদান (পিসিএম) এবং জিম্বাবুয়ের ইস্টগেট মডেলও কার্যকর হতে পারে। রাতের ঠান্ডায় জমে আর দিনের গরমে গলে তাপ শোষণকারী মোমভিত্তিক পিসিএম ছাদে বা দেয়ালে লাগালে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিদ্যুৎ খরচ ৩০ শতাংশ কমতে পারে। জিম্বাবুয়ের ইস্টগেট সেন্টার উইপোকার ঢিবির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো যান্ত্রিক শীতলীকরণ ছাড়াই প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলে পুরো অফিস ঠান্ডা রাখছে। কৈশিক পানি-নল প্রযুক্তি, যেখানে দেয়াল ও ছাদের ভেতরে মাটির নিচের ঠান্ডা পানির সূক্ষ্ম পাইপের জাল বিছানো থাকে, সিঙ্গাপুরের কিছু ভবনে ফ্যান বা এসি ছাড়াই তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনে। বাংলাদেশে নতুন সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও শিল্পকারখানার নকশায় এই প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

সৌর প্যানেল স্থাপন একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, অন্যদিকে ছাদকে ৩৫-৪০ শতাংশ কম উত্তপ্ত রাখে। ফসলের মাঠের ওপরে উঁচুতে প্যানেল বসালে নিচে ছায়ায় মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং পানির অপচয় কমে। প্রতিটি ইউনিয়নে সৌর ব্যাটারিচালিত সামাজিক শীতলীকরণ কেন্দ্র তৈরি করা যায়, যা বিদ্যুৎ বিভ্রাটেও চালু থাকবে এবং তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আশ্রয় দেবে।

জাতীয় তাপ ঝুঁকি মানচিত্র, হিট অ্যাকশন পরিকল্পনা ও শ্রম আইন সংস্কার জরুরি। বন্যার ঝুঁকি মানচিত্রের মতো রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, পাবনা ও খুলনাকে চিহ্নিত করে জাতীয় তাপ ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা দরকার। আহমেদাবাদে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা চালু হওয়ার পর মৃত্যুহার কমেছে, ভারতে এখন ১২০টির বেশি শহরে এই পরিকল্পনা চালু। বাংলাদেশে ৪৮ ঘণ্টা আগে সতর্কতা জারি, স্কুল-মসজিদ শীতলীকরণ কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেওয়া এবং ৪০ ডিগ্রির ওপরে গেলে শ্রমিকদের ছায়ায় বাধ্যতামূলক বিরতির বিধান এখনই বাস্তবায়নযোগ্য। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সবুজ শীতলীকরণ উদ্যোগের তৃতীয় পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ গ্যাস ও শক্তিসাশ্রয়ী শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালুর পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন নীতি দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু আগামী দশকের সবচেয়ে বড় জলবায়ু দুর্যোগ হতে পারে নীরব ঘাতক: তাপপ্রবাহ। ২০০৩ সালের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। প্রতিটি উদাহরণ একটি কথাই বলছে: প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়।

প্রশান্ত মহাসাগরে ইতিমধ্যে পশ্চিমা বায়ুর ঝোড়ো স্রোত তৈরি হচ্ছে। সময় কম। নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণের বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ শুধু এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই করবে না, বৈশ্বিক জলবায়ু অভিযোজনের একটি মডেল হয়ে উঠবে। এখন প্রশ্ন একটাই: তাপের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি কি আমরা আজই শুরু করব, নাকি পরবর্তী সংকটের অপেক্ষা করব?

যুক্তরাজ্যের ডি মন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স বিল্ডিং (১৯৯৩) এই নীতিতে নির্মিত ইউরোপের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ভবন ছিল।

ভারতে এখন স্থানীয়ভাবে এটি তৈরি হচ্ছে, প্রতি বর্গফুট ৮০-১২০ রুপিতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আঙুলের শব্দে আম্পায়ার বিভ্রান্ত, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে প্রতারণার নজির

সুপার এল নিনো আসছে: বাংলাদেশ কি অস্বাভাবিক গরমের জন্য প্রস্তুত?

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৩:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যভাগ থেকে পৃথিবী দেড় শ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র এল নিনো চক্রের মুখোমুখি হতে পারে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে আগস্ট মাস থেকে শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য, এটি নিছক আবহাওয়ার খামখেয়ালি নয়, বরং একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ভূগোল, দারিদ্র্য এবং শক্তি-ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যার জন্য দেশটি এখনো প্রস্তুত নয়।

এল নিনো কেবল উষ্ণতা বৃদ্ধিই নয়, এটি একটি সিস্টেম ফেইলিউরের কারণ হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা এল নিনোর মূল কারণ। এর ফলে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে বৃষ্টিপাত কমতে পারে, কৃষিখাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মডেল অনুযায়ী, এল নিনোর বছরে আমন ধানের ফলন ৮-১২ শতাংশ কমে যেতে পারে। ২০১৫-১৬ সালে বাংলাদেশে ২.৪ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছিল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব মতে, তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে শ্রমিকের কাজের ক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে, ২০২৬ সালে শুধু পোশাক ও নির্মাণ খাতে জিডিপির ক্ষতি প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড ইতিমধ্যেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। গ্রীষ্মকালে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০-৪০ শতাংশ কেবল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও ফ্যানের জন্য ব্যয় হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সুপার এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা ৩-৪ ডিগ্রি বাড়লে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোড যুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে প্রতি ১ ডিগ্রি বাড়লে হিটস্ট্রোকের প্রকোপ ১২ শতাংশ এবং ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত মৃত্যু ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপপ্রবাহে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে দেশের প্রায় ৫০ লাখ টিনের বাড়ি চুলায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই তীব্র তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কিছু সমাধান এখনই শুরু করা যেতে পারে। প্রাচীন ইরানের ‘বাদগির’ এবং রোমানদের ‘সৌরচিমনি’-এর মতো বায়ু-গ্রাহক ও সৌরচিমনি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণে কার্যকর হতে পারে। আধুনিক সংকর নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সৌরশক্তিচালিত এবং কোনো শীতলীকরণ গ্যাস ব্যবহার করে না। যুক্তরাজ্যের ডি মন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স বিল্ডিং এই নীতিতে নির্মিত একটি উদাহরণ। টিনশেড ঘরে বিদ্যুৎ ছাড়াই গরম বাতাস বের করার জন্য টারবাইন ভেন্টিলেটর বা তুফান টুপি ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভূতাপীয় বা মাটির বায়ু-টানেল প্রযুক্তিও একটি কার্যকর সমাধান। ভূপৃষ্ঠ থেকে চার মিটার নিচে সারা বছর মাটির তাপমাত্রা ২৫-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্থির থাকে। পিরোজপুরে জি ল্যাবের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাইরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘরের ভেতরে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে মাত্র দুটি ৫০ ওয়াটের ফ্যান ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে প্রচলিত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তুলনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় ৭৫-৮০ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রায় শূন্য।

প্রতিফলিত ছাদ বা শীতল ছাদ তাপ কমাতে সহায়ক। তীব্র গরমে একটি সাধারণ টিনের ছাদ ৬০-৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হতে পারে। সাদা প্রতিফলিত রং সেই তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি কমাতে পারে। ঢাকার করাইল বস্তিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গরমের সময় ঘরের ভেতর ৭.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কমানো সম্ভব হয়েছে। আহমেদাবাদে এই কর্মসূচি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ১০০ জনের প্রাণ বাঁচাচ্ছে। ব্র্যাক বা গ্রামীণ ব্যাংক ৫-১০ হাজার টাকার শীতলীকরণ ঋণ দিলে গরিব পরিবারগুলো বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় থেকেই তা পরিশোধ করতে পারবে।

বাঁশ, খড়, পাট ও মাটির মতো তাপ-অন্তরক উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। টিনের চালের ওপর বাঁশের মাচা বা খড়ের আবরণ একটি বায়ুস্তর তৈরি করে ছাদের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি পর্যন্ত কমাতে পারে। পাটখড়ি টিনের নিচে বিছালেও একই কাজ হয়। মাটির ইটের দেয়াল ও মেঝে দিনে তাপ শোষণ করে রাতে ছেড়ে দেয়, ফলে দিনের বেলা ঘরের ভেতর অনেক ঠান্ডা থাকে। ভিয়েতনামে বাঁশ ও পাটের চট দিয়ে নির্মিত পরিবেশবান্ধব টিনশেডে বাইরের চেয়ে ৬ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। মশরবিয়া বা বাঁশের জালি পর্দা সূর্যের আলো ছেঁকে ঘরে ঢোকার সময় বাতাস চলাচল বজায় রাখে, যা ঘরের তাপমাত্রা ৩-৫ ডিগ্রি কমাতে পারে।

নগর তাপ দ্বীপ প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ করিডর, জলাধার ও শীতল রাস্তা নির্মাণ জরুরি। ঢাকার অনেক এলাকায় কংক্রিট ও পিচের কারণে আশপাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে ৪-৭ ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় মাত্র ১০ শতাংশ সবুজায়ন শহরের গড় তাপমাত্রা ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে পারে। কলম্বিয়ার মেদেলিন শহর ৩০টি সবুজ করিডর তৈরি করে তাপমাত্রা ২-৩ ডিগ্রি কমিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সে প্রতিফলিত শীতল রাস্তার আবরণ ব্যবহার করে রাস্তার তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি কমানো হয়েছে। একটি মাঝারি পুকুরও আশপাশের পরিবেশ কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা রাখতে পারে, অথচ নগরায়ণের চাপে হাজার হাজার পুকুর ভরাট হচ্ছে।

মাটির পাত্রের ফ্রিজ ও পানির কুয়াশা ব্যবস্থা তাপ কমাতে কার্যকর। মাটির দুটো পাত্রের মাঝে ভেজা বালু দিলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ভেতরের তাপমাত্রা ১০-১৫ ডিগ্রি কমে যায়, যা মাত্র ৩০০-৫০০ টাকায় সম্ভব। নাইজেরিয়া ও সুদানে এটি বিদ্যুৎ ছাড়া ইনসুলিন ও সবজি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পানির কুয়াশা ছিটালে তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি কমানো সম্ভব। স্পেনের সেভিলে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জলপ্রণালি ও আধুনিক পানির কুয়াশা একত্রে ব্যবহার করে রাস্তার তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি কমানো হয়েছে।

দশা-পরিবর্তনকারী উপাদান (পিসিএম) এবং জিম্বাবুয়ের ইস্টগেট মডেলও কার্যকর হতে পারে। রাতের ঠান্ডায় জমে আর দিনের গরমে গলে তাপ শোষণকারী মোমভিত্তিক পিসিএম ছাদে বা দেয়ালে লাগালে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিদ্যুৎ খরচ ৩০ শতাংশ কমতে পারে। জিম্বাবুয়ের ইস্টগেট সেন্টার উইপোকার ঢিবির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো যান্ত্রিক শীতলীকরণ ছাড়াই প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলে পুরো অফিস ঠান্ডা রাখছে। কৈশিক পানি-নল প্রযুক্তি, যেখানে দেয়াল ও ছাদের ভেতরে মাটির নিচের ঠান্ডা পানির সূক্ষ্ম পাইপের জাল বিছানো থাকে, সিঙ্গাপুরের কিছু ভবনে ফ্যান বা এসি ছাড়াই তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনে। বাংলাদেশে নতুন সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও শিল্পকারখানার নকশায় এই প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

সৌর প্যানেল স্থাপন একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, অন্যদিকে ছাদকে ৩৫-৪০ শতাংশ কম উত্তপ্ত রাখে। ফসলের মাঠের ওপরে উঁচুতে প্যানেল বসালে নিচে ছায়ায় মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং পানির অপচয় কমে। প্রতিটি ইউনিয়নে সৌর ব্যাটারিচালিত সামাজিক শীতলীকরণ কেন্দ্র তৈরি করা যায়, যা বিদ্যুৎ বিভ্রাটেও চালু থাকবে এবং তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আশ্রয় দেবে।

জাতীয় তাপ ঝুঁকি মানচিত্র, হিট অ্যাকশন পরিকল্পনা ও শ্রম আইন সংস্কার জরুরি। বন্যার ঝুঁকি মানচিত্রের মতো রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, পাবনা ও খুলনাকে চিহ্নিত করে জাতীয় তাপ ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করা দরকার। আহমেদাবাদে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা চালু হওয়ার পর মৃত্যুহার কমেছে, ভারতে এখন ১২০টির বেশি শহরে এই পরিকল্পনা চালু। বাংলাদেশে ৪৮ ঘণ্টা আগে সতর্কতা জারি, স্কুল-মসজিদ শীতলীকরণ কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেওয়া এবং ৪০ ডিগ্রির ওপরে গেলে শ্রমিকদের ছায়ায় বাধ্যতামূলক বিরতির বিধান এখনই বাস্তবায়নযোগ্য। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সবুজ শীতলীকরণ উদ্যোগের তৃতীয় পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ গ্যাস ও শক্তিসাশ্রয়ী শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালুর পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন নীতি দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু আগামী দশকের সবচেয়ে বড় জলবায়ু দুর্যোগ হতে পারে নীরব ঘাতক: তাপপ্রবাহ। ২০০৩ সালের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। প্রতিটি উদাহরণ একটি কথাই বলছে: প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়।

প্রশান্ত মহাসাগরে ইতিমধ্যে পশ্চিমা বায়ুর ঝোড়ো স্রোত তৈরি হচ্ছে। সময় কম। নিষ্ক্রিয় শীতলীকরণের বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ শুধু এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই করবে না, বৈশ্বিক জলবায়ু অভিযোজনের একটি মডেল হয়ে উঠবে। এখন প্রশ্ন একটাই: তাপের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি কি আমরা আজই শুরু করব, নাকি পরবর্তী সংকটের অপেক্ষা করব?

যুক্তরাজ্যের ডি মন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স বিল্ডিং (১৯৯৩) এই নীতিতে নির্মিত ইউরোপের বৃহত্তম প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ভবন ছিল।

ভারতে এখন স্থানীয়ভাবে এটি তৈরি হচ্ছে, প্রতি বর্গফুট ৮০-১২০ রুপিতে।