লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৭ শতাংশে নিতে বড় পরিকল্পনা সরকারের

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করার কাজ শেষ করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যার আলোকে পরবর্তীতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার। তিনি বলেন, পর্যটন খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে তথ্য-উপাত্তের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে কাজ চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আওতায় বর্তমানে 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতের কর্মসংস্থান, পর্যটকের সংখ্যা, জিডিপিতে অবদান এবং ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড পর্যটনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান এখনও সীমিত। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত হোটেল-মোটেল, বিনোদন সুবিধা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং ও বিপণনেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব ও দেশের জ্যেষ্ঠ পর্যটন বিশেষজ্ঞ তৌফিক রহমান বলেন, পর্যটনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হলে প্রথমেই বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতে বাংলাদেশকে যে 'রেড মার্ক' বা উচ্চ সতর্কতাপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা পরিবর্তন করা জরুরি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন এবং কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটি সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৯৯৯-এর পাশাপাশি বিশেষায়িত হেল্পলাইন কার্যকর করা এবং বিশ্বখ্যাত ট্রাভেল ব্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টর নিয়ে কাজ করা ওয়েসিস কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী জুয়েল খান মনে করেন, বাংলাদেশে বিশ্বমানের অবকাঠামো থাকলেও যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং এবং ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত পর্যটক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও আন্তর্জাতিক মানের সার্ভিস কালচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে এর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায়।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর করা, ই-ভিসা সুবিধা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রেস্তোরাঁয় করছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন'। এই এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যটন গন্তব্যের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি ও তথ্য সরবরাহের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এছাড়া পর্যটন খাতে উৎকর্ষ ও টেকসই উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে এবারই প্রথম ১৩টি ক্যাটাগরিতে 'বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬' দেওয়া হবে। তবে সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ কেবল মাস্টারপ্ল্যান তৈরি নয়, বরং অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগ, ভিসা জটিলতা ও নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিনের समस्याগুলো সমাধান করে এর সফল বাস্তবায়ন করা।

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্ত্র হাতে ভাইরাল শিবলু অবশেষে আনোয়ারায় গ্রেপ্তার

জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৭ শতাংশে নিতে বড় পরিকল্পনা সরকারের

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যটন খাতের মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করার কাজ শেষ করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যার আলোকে পরবর্তীতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন ভবনে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার। তিনি বলেন, পর্যটন খাতের প্রকৃত চিত্র জানতে তথ্য-উপাত্তের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে কাজ চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আওতায় বর্তমানে 'ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট' তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতের কর্মসংস্থান, পর্যটকের সংখ্যা, জিডিপিতে অবদান এবং ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড পর্যটনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ ও মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও জাতীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান এখনও সীমিত। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ভালো যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত হোটেল-মোটেল, বিনোদন সুবিধা, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিং ও বিপণনেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব ও দেশের জ্যেষ্ঠ পর্যটন বিশেষজ্ঞ তৌফিক রহমান বলেন, পর্যটনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হলে প্রথমেই বিদেশি পর্যটকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন দেশের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতে বাংলাদেশকে যে 'রেড মার্ক' বা উচ্চ সতর্কতাপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা পরিবর্তন করা জরুরি। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন এবং কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এটি সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৯৯৯-এর পাশাপাশি বিশেষায়িত হেল্পলাইন কার্যকর করা এবং বিশ্বখ্যাত ট্রাভেল ব্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টর নিয়ে কাজ করা ওয়েসিস কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী জুয়েল খান মনে করেন, বাংলাদেশে বিশ্বমানের অবকাঠামো থাকলেও যথাযথ ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং এবং ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত পর্যটক পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও আন্তর্জাতিক মানের সার্ভিস কালচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে এর সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায়।

পর্যটন খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর করা, ই-ভিসা সুবিধা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রেস্তোরাঁয় করছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন'। এই এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যটন গন্তব্যের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি ও তথ্য সরবরাহের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এছাড়া পর্যটন খাতে উৎকর্ষ ও টেকসই উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে এবারই প্রথম ১৩টি ক্যাটাগরিতে 'বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬' দেওয়া হবে। তবে সরকারের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ কেবল মাস্টারপ্ল্যান তৈরি নয়, বরং অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যোগাযোগ, ভিসা জটিলতা ও নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিনের समस्याগুলো সমাধান করে এর সফল বাস্তবায়ন করা।