লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল: ৩ লাখের বেশি মানুষ নিরাপদ স্থানে

ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানলের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও প্রবল বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। দুই দেশে এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষকে তাদের বাড়িঘর থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, বিশেষ করে জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে শনিবার রাতে আরও ৫৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশটিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছেছে।

দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নিকোলা ব্রাজ জানান, দাবানল এতটাই তীব্র যে এটি নিজস্ব বাতাস ও ঘূর্ণি তৈরি করছে, যা আগুনের গতিপথকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের অনেক বাইরে এবং সামনে আরও একটি কঠিন রাত অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সেনাসদস্যরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফায়ারব্রেক তৈরি করছেন যাতে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, সরকার যতদিন প্রয়োজন ততদিন সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন করা হবে।

শনিবার প্রবল বাতাসে ধোঁয়া বোর্দো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বোর্দোর কাছে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ পর্যটক স্পেনসার র‍্যান্ডাল জানান, শনিবার ভোরে পরিবার নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সরে গেলেও সেখানে পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বোর্দোতে অবস্থানরত আরেক ব্রিটিশ দম্পতি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাড়া করা বাড়ির সুইমিংপুল ছাইয়ে ঢেকে গেছে এবং বাইরে হাঁটলে পায়ে কালো ছাই লেগে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধোঁয়া ফুসফুসে তীব্র প্রভাব ফেলছে। এছাড়া সাঁ-ওবাঁ-দ্য-মেদক এলাকার বাসিন্দারা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করেছেন।

দাবানলের কারণে রোববার অনুষ্ঠিতব্য বিখ্যাত সাইকেল প্রতিযোগিতা ট্যুর দ্য ফ্রান্সের শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দাবানলকবলিত এলাকায় মোতায়েনের সুবিধার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বর্তমানে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৩০টি বড় দাবানল জ্বলছে এবং সরকার একে অভূতপূর্ব পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

স্পেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি মোটেও সহায়তাকারী নয় এবং প্রবল বাতাস আগুনকে আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনের রাত স্পেনের জন্য মোটেও সহজ হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ২৮ হাজার মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। শনিবার রাতে তোলেদোর কাছে অন্তত আটটি পৌর এলাকার বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াস আয়ুসো একে ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যেখানে গত এক দশকে বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক লাখ হেক্টর। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা আগুনে পুড়ে গেছে।

ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও দাবানলের প্রভাব বাড়ছে। ইতালির সিসিলি দ্বীপে ৩৫০টির বেশি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি বড় অগ্নিকাণ্ড। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কেও টানা ১০ দিন ধরে দাবানল জ্বলছে এবং শুক্রবার সেখানে বড় ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব সতর্ক করে বলেছেন, এ বছর ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত বছর গ্রীষ্মে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছিল, তবে এ বছর দাবানলের মৌসুম আগেই শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা নতুন করে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছেন। ফ্রান্সের অনুরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। এর আওতায় ক্রোয়েশিয়া থেকে তিনটি কানাডেয়ার অগ্নিনির্বাপণ বিমান, পর্তুগাল থেকে দুটি এয়ার ট্র্যাক্টর বিমান, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া থেকে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং রোমানিয়ার ৪০ সদস্যের বন অগ্নিনির্বাপণ দল ফ্রান্সে পাঠানো হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদপুরে হাতির ধাক্কায় ইজিবাইক উল্টে ১০ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু

ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল: ৩ লাখের বেশি মানুষ নিরাপদ স্থানে

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:১৯:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানলের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তীব্র তাপপ্রবাহ ও প্রবল বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। দুই দেশে এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষকে তাদের বাড়িঘর থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, বিশেষ করে জিরন্দ ও লঁদ অঞ্চলে শনিবার রাতে আরও ৫৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশটিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে পৌঁছেছে।

দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নিকোলা ব্রাজ জানান, দাবানল এতটাই তীব্র যে এটি নিজস্ব বাতাস ও ঘূর্ণি তৈরি করছে, যা আগুনের গতিপথকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণের অনেক বাইরে এবং সামনে আরও একটি কঠিন রাত অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। সেনাসদস্যরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফায়ারব্রেক তৈরি করছেন যাতে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায়। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, সরকার যতদিন প্রয়োজন ততদিন সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন করা হবে।

শনিবার প্রবল বাতাসে ধোঁয়া বোর্দো শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বোর্দোর কাছে ছুটি কাটাতে যাওয়া ব্রিটিশ পর্যটক স্পেনসার র‍্যান্ডাল জানান, শনিবার ভোরে পরিবার নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে সরে গেলেও সেখানে পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বোর্দোতে অবস্থানরত আরেক ব্রিটিশ দম্পতি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাড়া করা বাড়ির সুইমিংপুল ছাইয়ে ঢেকে গেছে এবং বাইরে হাঁটলে পায়ে কালো ছাই লেগে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধোঁয়া ফুসফুসে তীব্র প্রভাব ফেলছে। এছাড়া সাঁ-ওবাঁ-দ্য-মেদক এলাকার বাসিন্দারা পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করেছেন।

দাবানলের কারণে রোববার অনুষ্ঠিতব্য বিখ্যাত সাইকেল প্রতিযোগিতা ট্যুর দ্য ফ্রান্সের শেষ ধাপের দূরত্ব ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দাবানলকবলিত এলাকায় মোতায়েনের সুবিধার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বর্তমানে ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৩০টি বড় দাবানল জ্বলছে এবং সরকার একে অভূতপূর্ব পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছে।

স্পেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি মোটেও সহায়তাকারী নয় এবং প্রবল বাতাস আগুনকে আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে দিতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামনের রাত স্পেনের জন্য মোটেও সহজ হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ২৮ হাজার মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। শনিবার রাতে তোলেদোর কাছে অন্তত আটটি পৌর এলাকার বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াস আয়ুসো একে ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, যেখানে গত এক দশকে বার্ষিক গড় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক লাখ হেক্টর। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশটিতে ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা আগুনে পুড়ে গেছে।

ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও দাবানলের প্রভাব বাড়ছে। ইতালির সিসিলি দ্বীপে ৩৫০টির বেশি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি বড় অগ্নিকাণ্ড। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কেও টানা ১০ দিন ধরে দাবানল জ্বলছে এবং শুক্রবার সেখানে বড় ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব সতর্ক করে বলেছেন, এ বছর ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত বছর গ্রীষ্মে প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছিল, তবে এ বছর দাবানলের মৌসুম আগেই শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা নতুন করে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছেন। ফ্রান্সের অনুরোধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। এর আওতায় ক্রোয়েশিয়া থেকে তিনটি কানাডেয়ার অগ্নিনির্বাপণ বিমান, পর্তুগাল থেকে দুটি এয়ার ট্র্যাক্টর বিমান, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া থেকে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং রোমানিয়ার ৪০ সদস্যের বন অগ্নিনির্বাপণ দল ফ্রান্সে পাঠানো হচ্ছে।