লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস: স্থাপত্য ও প্রযুক্তির বিস্ময়

আকাশ পানে ছুঁয়ে থাকা স্থাপনাগুলো কেবল কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের সামষ্টিক অবয়ব নয়; এগুলো মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক। প্রতি বছর ৩রা সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার বা গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস পালিত হয়। এই দিবসটি মূলত মানব মেধা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থাপত্য এবং প্রকৌশলের সম্মিলিত সাফল্যকে উদযাপনের দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সীমাবদ্ধ নয়; সৃজনশীল চিন্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একসময় অসম্ভব মনে হওয়া স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ বা গগনচুম্বী ভবন বলতে সাধারণত অত্যন্ত উঁচু বহুতল ভবনকে বোঝায়। ১৮৮০ সালের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। গিনেস বিশ্ব রেকর্ড অনুযায়ী, ১৮৮৫ সালে শিকাগোতে স্থপতি মেজর উইলিয়াম লেবারন জেনি প্রথম আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করেন। গগনচুম্বী ভবনের জনক হিসেবে পরিচিত লুইস এইচ. সুল্লিভানের জন্মদিনে তাঁকে সম্মান জানাতেই এই দিনটি পালিত হয়।

একটি আধুনিক সুউচ্চ ভবনের নকশায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নগরপরিকল্পনার সমন্বয় ঘটে। প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এবং মানুষের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো মাথায় রেখে নকশা করা হয়, যা মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অনন্য প্রদর্শনী। আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খানের আবিষ্কৃত ‘টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ এক বৈপ্লবিক ভিত্তি তৈরি করে। এই পদ্ধতি ছাড়া উইলিস টাওয়ার বা বুর্জ খলিফার মতো বহুতল ভবন তৈরি অসম্ভব ছিল। পরবর্তীকালে আমেরিকান প্রকৌশলী উইলিয়াম এফ. বেকার এই টিউবুলার পদ্ধতিকে উন্নত করে ‘বাট্রেসড কোর’ সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, যা বুর্জ খলিফার মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত ৮২৮ মিটার উচ্চতার বুর্জ খলিফা আধুনিক প্রকৌশলের অনন্য নিদর্শন। তালিকার পরের দিকে রয়েছে মালয়েশিয়ার মেরদেকা ১১৮, চীনের সাংহাই টাওয়ার, সৌদি আরবের মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার এবং চীনের পিং অ্যান ফাইন্যান্স সেন্টার। এসব ভবন শক্তি সাশ্রয়, বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকম্প প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও সীমিত জমির কারণে ওপরের দিকে বিস্তৃত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ফলে নিউইয়র্ক, শিকাগো, দুবাই, সাংহাই, হংকং ও সিঙ্গাপুরের মতো শহরে স্কাইস্ক্র্যাপার নগর-পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও শান্তা পিনাকলের মূল স্থপতি এহসান খান (ইকে আর্কিটেক্টস) এবং প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে মাইনহার্ট সিঙ্গাপুর। মতিঝিলের সিটি সেন্টারের নকশায় যৌথভাবে স্থপতি টিআইএম নুরুন্নবী চৌধুরী ও বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার (সাইট ফোর্স ও আরবান কন্টেক্সট) কাজ করেছেন। তেজগাঁওয়ের ইনস্টার ট্রেড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ভবনের প্রধান স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ (ভলিউমজিরো) এবং গুলশানের হিলটন ঢাকা ভবনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য নকশায় এইচবি ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিয়েছে ইইসি লিনকন স্কট।

দিবসটি আমাদের কেবল ভবনের উচ্চতা নয়, বরং উন্নয়নের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষের তৈরি ভবন যতই আকাশ ছুঁয়ে ফেলুক, তার ভিত্তি থাকতে হয় মাটিতেই—যা নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সুশৃঙ্খল নগরপরিকল্পনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

জনপ্রিয় সংবাদ

গৌরীপুরে শতবর্ষী আর কে স্কুল ভবন রক্ষায় মতবিনিময় সভা

আজ বিশ্ব গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস: স্থাপত্য ও প্রযুক্তির বিস্ময়

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:২০:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আকাশ পানে ছুঁয়ে থাকা স্থাপনাগুলো কেবল কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচের সামষ্টিক অবয়ব নয়; এগুলো মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক। প্রতি বছর ৩রা সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার বা গগনচুম্বী অট্টালিকা দিবস পালিত হয়। এই দিবসটি মূলত মানব মেধা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্থাপত্য এবং প্রকৌশলের সম্মিলিত সাফল্যকে উদযাপনের দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সীমাবদ্ধ নয়; সৃজনশীল চিন্তা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একসময় অসম্ভব মনে হওয়া স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ বা গগনচুম্বী ভবন বলতে সাধারণত অত্যন্ত উঁচু বহুতল ভবনকে বোঝায়। ১৮৮০ সালের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। গিনেস বিশ্ব রেকর্ড অনুযায়ী, ১৮৮৫ সালে শিকাগোতে স্থপতি মেজর উইলিয়াম লেবারন জেনি প্রথম আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করেন। গগনচুম্বী ভবনের জনক হিসেবে পরিচিত লুইস এইচ. সুল্লিভানের জন্মদিনে তাঁকে সম্মান জানাতেই এই দিনটি পালিত হয়।

একটি আধুনিক সুউচ্চ ভবনের নকশায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নগরপরিকল্পনার সমন্বয় ঘটে। প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এবং মানুষের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো মাথায় রেখে নকশা করা হয়, যা মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অনন্য প্রদর্শনী। আধুনিক গগনচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণের নেপথ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খানের আবিষ্কৃত ‘টিউব স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ এক বৈপ্লবিক ভিত্তি তৈরি করে। এই পদ্ধতি ছাড়া উইলিস টাওয়ার বা বুর্জ খলিফার মতো বহুতল ভবন তৈরি অসম্ভব ছিল। পরবর্তীকালে আমেরিকান প্রকৌশলী উইলিয়াম এফ. বেকার এই টিউবুলার পদ্ধতিকে উন্নত করে ‘বাট্রেসড কোর’ সিস্টেম উদ্ভাবন করেন, যা বুর্জ খলিফার মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত ৮২৮ মিটার উচ্চতার বুর্জ খলিফা আধুনিক প্রকৌশলের অনন্য নিদর্শন। তালিকার পরের দিকে রয়েছে মালয়েশিয়ার মেরদেকা ১১৮, চীনের সাংহাই টাওয়ার, সৌদি আরবের মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার এবং চীনের পিং অ্যান ফাইন্যান্স সেন্টার। এসব ভবন শক্তি সাশ্রয়, বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকম্প প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

শহরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও সীমিত জমির কারণে ওপরের দিকে বিস্তৃত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ফলে নিউইয়র্ক, শিকাগো, দুবাই, সাংহাই, হংকং ও সিঙ্গাপুরের মতো শহরে স্কাইস্ক্র্যাপার নগর-পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও শান্তা পিনাকলের মূল স্থপতি এহসান খান (ইকে আর্কিটেক্টস) এবং প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে মাইনহার্ট সিঙ্গাপুর। মতিঝিলের সিটি সেন্টারের নকশায় যৌথভাবে স্থপতি টিআইএম নুরুন্নবী চৌধুরী ও বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার (সাইট ফোর্স ও আরবান কন্টেক্সট) কাজ করেছেন। তেজগাঁওয়ের ইনস্টার ট্রেড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ভবনের প্রধান স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ (ভলিউমজিরো) এবং গুলশানের হিলটন ঢাকা ভবনের আন্তর্জাতিক স্থাপত্য নকশায় এইচবি ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিয়েছে ইইসি লিনকন স্কট।

দিবসটি আমাদের কেবল ভবনের উচ্চতা নয়, বরং উন্নয়নের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষের তৈরি ভবন যতই আকাশ ছুঁয়ে ফেলুক, তার ভিত্তি থাকতে হয় মাটিতেই—যা নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সুশৃঙ্খল নগরপরিকল্পনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।