লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জন্মসনদে অদ্ভুত সব নাম, সংশোধনের ভোগান্তিতে সাধারণ নাগরিক

কানিজ ফাতেমার ১১ বছর বয়সী ছেলে রাজধানীর একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে এবং এবার বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্কুল থেকে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় জন্মনিবন্ধন সনদ চাওয়া হয়। ২০১৫ সালে শুধু ইংরেজিতে ছেলের সনদ নিলেও, এখন দুই ভাষাতেই সনদ পেতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ওয়েবসাইটে গিয়ে তিনি চমকে যান। সেখানে ছেলের বাংলা নাম লেখা ‘ক্‌জ্‌ক্‌ল্‌জ্‌’ এবং স্বামীর নাম লেখা ‘লক্‌জ্‌ক্‌’। এমন বিড়ম্বনা কেবল তার একার নয়; মিরপুর-১০ এ অবস্থিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নামবিভ্রাটের কারণে অনেকেই সংশোধনের জন্য ভিড় করছেন। মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি জানান, আবেদনকারীর মায়ের নামের জায়গায় ‘দতককা’ লেখা এসেছে। নাছির আহম্মেদ বেলাল নামের অন্য একজন জানান, তার ও তার স্ত্রীর নামের জায়গায় ‘LJKLJF’ এসেছে, যা তিনি নিজে করেননি, নিবন্ধন কার্যালয় থেকেই এমন ভুল হয়েছে।

নাছির আহম্মেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে ভুল আমি করিনি, সে ভুলের দায় কেন আমাকে নিতে হচ্ছে, কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে?’ তিনি জানান, দুই মেয়ের জন্মসনদ সংশোধনের আবেদন করতে কম্পিউটারের দোকানে তাকে ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। এই প্রতিবেদন তৈরিতে যে আটজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের জন্মসনদ ২০২০ সালের আগে করা। এদিকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন হয়েছে এবং নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ নিবন্ধন সংশোধিত হয়েছে। এই সময়ে নাম-ঠিকানা সংশোধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ৫০ টাকা ফি হিসেবেই নাগরিকেরা সাড়ে ১৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। গত বছর এই খাতে ভুক্তভোগীরা প্রায় ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছেন।

নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, তিন বছর আগে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়ার উদ্যোগ না থাকায় এবং শুধু একটি ভাষায় আবেদনের সময় অন্য ঘরের তথ্যে ভুল টাইপ করার ফলে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে এক পাতায় থাকায় যে কোনো একটি ভাষার ভুল পুরো সনদটিই ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলে। সিটি করপোরেশন এলাকায় এই সংশোধনের জন্য অনলাইনে আবেদন থেকে শুরু করে কাউন্সিলর কার্যালয়, অঞ্চল কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের অনুমোদন পর্যন্ত চারটি ধাপ পার হতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি ইউএনও কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।

ফারজানা রহমান নামের আরেক অভিভাবক জানান, তার সন্তানের সনদে নাম এসেছে ‘ইউওইউও’, এমনকি তার এবং তার স্বামীর নামের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তুহিনা আক্তার জানান, তার মেয়ের নাম ঠিক থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর নামের জায়গায় শুধু ‘০’ আর ‘–’ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের জানান, নিবন্ধন কার্যালয়ের এ ধরনের ভুল অনেক ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে অভিযোগ রয়েছে, যা একটি অসাধু চক্রের টাকা উপার্জনের ফাঁদ হতে পারে। এ জন্য জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করা দরকার বলে মনে করেন এ বি এম জুবায়ের। এই প্রতিবেদককেও নিজের ও সন্তানদের জন্মসনদ সংশোধন করতে হয়েছে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেওয়ার পরপরই নিবন্ধনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করলে এই ভোগান্তি কমতে পারে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, ২০২৩ সাল থেকে জালিয়াতি প্রতিরোধে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আগের ভুলগুলো কয়েক বছর ধরেই সংশোধন করা হচ্ছে এবং নাগরিকদের সচেতন হয়ে অন্যের সাহায্য না নিয়ে নিজে আবেদন করলে ভুল কম হবে। এদিকে মোহাম্মদ আমির হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ২০০৮ সালের পুরনো জন্মসনদ অঞ্চল পরিবর্তনের কারণে এখন দুই অঞ্চলে দুটি দেখাচ্ছে, যার ফলে সাত দিন ধরে তিনি সংশোধন করতে ছুটছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় লটারির মাধ্যমে ১৮ সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করল আইন মন্ত্রণালয়

জন্মসনদে অদ্ভুত সব নাম, সংশোধনের ভোগান্তিতে সাধারণ নাগরিক

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

কানিজ ফাতেমার ১১ বছর বয়সী ছেলে রাজধানীর একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে এবং এবার বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্কুল থেকে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় জন্মনিবন্ধন সনদ চাওয়া হয়। ২০১৫ সালে শুধু ইংরেজিতে ছেলের সনদ নিলেও, এখন দুই ভাষাতেই সনদ পেতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ওয়েবসাইটে গিয়ে তিনি চমকে যান। সেখানে ছেলের বাংলা নাম লেখা ‘ক্‌জ্‌ক্‌ল্‌জ্‌’ এবং স্বামীর নাম লেখা ‘লক্‌জ্‌ক্‌’। এমন বিড়ম্বনা কেবল তার একার নয়; মিরপুর-১০ এ অবস্থিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নামবিভ্রাটের কারণে অনেকেই সংশোধনের জন্য ভিড় করছেন। মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি জানান, আবেদনকারীর মায়ের নামের জায়গায় ‘দতককা’ লেখা এসেছে। নাছির আহম্মেদ বেলাল নামের অন্য একজন জানান, তার ও তার স্ত্রীর নামের জায়গায় ‘LJKLJF’ এসেছে, যা তিনি নিজে করেননি, নিবন্ধন কার্যালয় থেকেই এমন ভুল হয়েছে।

নাছির আহম্মেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে ভুল আমি করিনি, সে ভুলের দায় কেন আমাকে নিতে হচ্ছে, কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে?’ তিনি জানান, দুই মেয়ের জন্মসনদ সংশোধনের আবেদন করতে কম্পিউটারের দোকানে তাকে ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। এই প্রতিবেদন তৈরিতে যে আটজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের জন্মসনদ ২০২০ সালের আগে করা। এদিকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন হয়েছে এবং নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ নিবন্ধন সংশোধিত হয়েছে। এই সময়ে নাম-ঠিকানা সংশোধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ৫০ টাকা ফি হিসেবেই নাগরিকেরা সাড়ে ১৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। গত বছর এই খাতে ভুক্তভোগীরা প্রায় ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছেন।

নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, তিন বছর আগে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়ার উদ্যোগ না থাকায় এবং শুধু একটি ভাষায় আবেদনের সময় অন্য ঘরের তথ্যে ভুল টাইপ করার ফলে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে এক পাতায় থাকায় যে কোনো একটি ভাষার ভুল পুরো সনদটিই ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলে। সিটি করপোরেশন এলাকায় এই সংশোধনের জন্য অনলাইনে আবেদন থেকে শুরু করে কাউন্সিলর কার্যালয়, অঞ্চল কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের অনুমোদন পর্যন্ত চারটি ধাপ পার হতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি ইউএনও কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত।

ফারজানা রহমান নামের আরেক অভিভাবক জানান, তার সন্তানের সনদে নাম এসেছে ‘ইউওইউও’, এমনকি তার এবং তার স্বামীর নামের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তুহিনা আক্তার জানান, তার মেয়ের নাম ঠিক থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর নামের জায়গায় শুধু ‘০’ আর ‘–’ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের জানান, নিবন্ধন কার্যালয়ের এ ধরনের ভুল অনেক ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে অভিযোগ রয়েছে, যা একটি অসাধু চক্রের টাকা উপার্জনের ফাঁদ হতে পারে। এ জন্য জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করা দরকার বলে মনে করেন এ বি এম জুবায়ের। এই প্রতিবেদককেও নিজের ও সন্তানদের জন্মসনদ সংশোধন করতে হয়েছে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেওয়ার পরপরই নিবন্ধনের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করলে এই ভোগান্তি কমতে পারে।

রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, ২০২৩ সাল থেকে জালিয়াতি প্রতিরোধে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আগের ভুলগুলো কয়েক বছর ধরেই সংশোধন করা হচ্ছে এবং নাগরিকদের সচেতন হয়ে অন্যের সাহায্য না নিয়ে নিজে আবেদন করলে ভুল কম হবে। এদিকে মোহাম্মদ আমির হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ২০০৮ সালের পুরনো জন্মসনদ অঞ্চল পরিবর্তনের কারণে এখন দুই অঞ্চলে দুটি দেখাচ্ছে, যার ফলে সাত দিন ধরে তিনি সংশোধন করতে ছুটছেন।