লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেনমোহর পেতে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না: হাইকোর্ট

স্ত্রীকে দেনমোহর দেওয়ার জন্য বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতে হবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেনমোহর হচ্ছে স্বামীর ওপর স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাওনা, যা অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলায় বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া ৩২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছেন, কোনো স্ত্রী যদি দেনমোহর আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামী তা পরিশোধে বিলম্ব করেন, তবে বিচারিক আদালত ওই স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, মোহর বা দেনমোহর হলো স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার। এটি বিয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি আইনি বাধ্যবাধকতা, যা স্বামী কোনোভাবেই ফেরত চাইতে পারেন না। তবে স্ত্রী যদি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তা মওকুফ করেন, তবেই তা গ্রহণযোগ্য হবে। আইনসম্মত বিয়ের ক্ষেত্রে দেনমোহর পরিশোধে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্ত্রী দাবি করা মাত্রই বিলম্বিত দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। বিয়ের চুক্তি ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে এটি অবিলম্বে বা চাহিদা মোতাবেক পরিশোধযোগ্য। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ইসলামি আইন ও ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে হাইকোর্ট বা অন্য কোনো আদালতের দেনমোহরের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া বা মওকুফ করার কোনো এখতিয়ার নেই। তবে স্ত্রী যদি কোনো জোরজবরদস্তি, প্রতারণা বা অযাচিত প্রভাব ছাড়া সম্পূর্ণ সচেতন ও স্বাধীনভাবে নিজের দেনমোহর আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করতে চান, কেবল তখনই তা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে এই দম্পতির বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যৌতুক দাবি ও পারস্পরিক মনোমালিন্যের জেরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ চেয়ে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী। স্বামী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে পারিবারিক আদালত একতরফা ডিক্রি জারি করেন। ডিক্রিতে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং সন্তানের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কন্যাসন্তানের বিয়ের আগপর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই ডিক্রির বিরুদ্ধে স্বামী অধস্তন আদালতে আবেদন করে ব্যর্থ হন এবং জেলা জজ আদালতেও তাঁর আপিল ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট খারিজ হয়। এরপর হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন স্বামী। আবেদনে তিনি দাবি করেন, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি আর্থিক সংকটে আছেন এবং এককালীন পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বিধায় কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চান। হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করলেও চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুলটি খারিজ করে দেন এবং বকেয়া দেনমোহর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণের সব টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টে স্ত্রীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দেনমোহর কমানোর কোনো সুযোগ আদালতের নেই। দেনমোহর আদায়ের মামলা করতে গিয়ে নারীদের অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। সামর্থ্য থাকার পরও স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে হয়রানি করেন, তবে বিচারিক আদালত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারবেন। এই রায়ের ফলে দেনমোহর নিয়ে নারীদের হয়রানি বন্ধের এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নতুন পথ তৈরি হলো। এর ফলে মামলা দীর্ঘায়িত করার চেয়ে পক্ষগুলো দ্রুত মীমাংসার দিকে এগোবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে দালালের ফাঁদ, নিঃস্ব হচ্ছেন বহু বাংলাদেশি

দেনমোহর পেতে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না: হাইকোর্ট

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

স্ত্রীকে দেনমোহর দেওয়ার জন্য বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা স্বামীর মৃত্যুর প্রতীক্ষা করতে হবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী দেনমোহর হচ্ছে স্বামীর ওপর স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাওনা, যা অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলায় বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া ৩২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছেন, কোনো স্ত্রী যদি দেনমোহর আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামী তা পরিশোধে বিলম্ব করেন, তবে বিচারিক আদালত ওই স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, মোহর বা দেনমোহর হলো স্ত্রীর একটি স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার। এটি বিয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি আইনি বাধ্যবাধকতা, যা স্বামী কোনোভাবেই ফেরত চাইতে পারেন না। তবে স্ত্রী যদি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তা মওকুফ করেন, তবেই তা গ্রহণযোগ্য হবে। আইনসম্মত বিয়ের ক্ষেত্রে দেনমোহর পরিশোধে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্ত্রী দাবি করা মাত্রই বিলম্বিত দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। বিয়ের চুক্তি ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে এটি অবিলম্বে বা চাহিদা মোতাবেক পরিশোধযোগ্য। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ইসলামি আইন ও ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে হাইকোর্ট বা অন্য কোনো আদালতের দেনমোহরের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া বা মওকুফ করার কোনো এখতিয়ার নেই। তবে স্ত্রী যদি কোনো জোরজবরদস্তি, প্রতারণা বা অযাচিত প্রভাব ছাড়া সম্পূর্ণ সচেতন ও স্বাধীনভাবে নিজের দেনমোহর আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করতে চান, কেবল তখনই তা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে এই দম্পতির বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যৌতুক দাবি ও পারস্পরিক মনোমালিন্যের জেরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ চেয়ে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী। স্বামী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে পারিবারিক আদালত একতরফা ডিক্রি জারি করেন। ডিক্রিতে স্ত্রীকে ১৮ লাখ টাকা বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং সন্তানের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কন্যাসন্তানের বিয়ের আগপর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এই ডিক্রির বিরুদ্ধে স্বামী অধস্তন আদালতে আবেদন করে ব্যর্থ হন এবং জেলা জজ আদালতেও তাঁর আপিল ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট খারিজ হয়। এরপর হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন স্বামী। আবেদনে তিনি দাবি করেন, ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি আর্থিক সংকটে আছেন এবং এককালীন পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বিধায় কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চান। হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করলেও চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুলটি খারিজ করে দেন এবং বকেয়া দেনমোহর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ভরণপোষণের সব টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টে স্ত্রীর পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দেনমোহর কমানোর কোনো সুযোগ আদালতের নেই। দেনমোহর আদায়ের মামলা করতে গিয়ে নারীদের অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। সামর্থ্য থাকার পরও স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে হয়রানি করেন, তবে বিচারিক আদালত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারবেন। এই রায়ের ফলে দেনমোহর নিয়ে নারীদের হয়রানি বন্ধের এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নতুন পথ তৈরি হলো। এর ফলে মামলা দীর্ঘায়িত করার চেয়ে পক্ষগুলো দ্রুত মীমাংসার দিকে এগোবে।