লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিধি ছাড়াই সিএসআর খাতে কোটি টাকা খরচ বিএসইসির

কোনো ধরনের আইনি কাঠামো বা নীতিমালা ছাড়াই করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে সিএসআর ব্যয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও যথেচ্ছভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মূলত সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয়ের এই বিতর্কিত প্রচলন শুরু হয়।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী জানান, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সিএসআর করার কোনো সুযোগ বা আইনি ভিত্তি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত করপোরেট সেক্টর তাদের লাভের একটি অংশ সমাজকল্যাণে ব্যয় করে, কিন্তু বিএসইসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধান নেই। সাবেক কমিশনার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী একে চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিএসআর করতে পারলেও বিএসইসির মতো অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং এটি শিবলী রুবাইয়াতের আমলের একটি অনিয়ম।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসইসি নিয়মিতভাবে সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঁচ কোটি টাকা, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশেষায়িত হাসপাতালে এক কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বিএসইসির নিজস্ব ভবনের ছাদে মসজিদ ও স্পোর্টস জোন নির্মাণের জন্য বিএসইসির অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে এক কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ। এছাড়া সাকিব আল হাসানকে শুভেচ্ছা দূত থাকাকালীন মাগুরা সদর হাসপাতালে সহায়তার জন্য ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে বিএসইসির শুভেচ্ছা দূত হন ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।

ব্যয় পর্যালোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠনের প্রতি বিশেষ প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। ঢাবি কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, বনভোজন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাবদ ৩২ লাখ ৫৯ হাজার টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিএসইসির কর্মচারী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা সহায়তা এবং উৎসব বোনাস হিসেবেও সিএসআর তহবিল থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বরিশালের বাকেরগঞ্জে বিভিন্ন কবরস্থান, মসজিদ ও ঈদগাহ উন্নয়নের জন্য কয়েক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা তৎকালীন কমিশনার আবদুল হালিমের নিজ এলাকা হওয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। তবে আবদুল হালিম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আবেদন যাচাই-বাছাই করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সিএসআর খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাত কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, প্রতিটি ব্যয় কমিশন সভায় অনুমোদিত এবং বর্তমানে এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। অন্যদিকে রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিএসইসির আইনে সিএসআর ব্যয়ের কোনো বিধান না থাকায় এই ব্যয় আইনবহির্ভূত।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালানোর পর ১০ আগস্ট বিএসইসির চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ করেন শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম। শেয়ারবাজারে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, কারসাজি, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের মামলায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তার সময়ে সিএসআর ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন অপর কমিশনার ড. মিজানুর রহমান জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত তার মনে নেই। এছাড়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনও বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান দিয়েছিল, তবে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে শপিংমলে বিস্ফোরণ ও ধস, বহু হতাহতের শঙ্কা

বিধি ছাড়াই সিএসআর খাতে কোটি টাকা খরচ বিএসইসির

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:১৮:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

কোনো ধরনের আইনি কাঠামো বা নীতিমালা ছাড়াই করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে সিএসআর ব্যয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও যথেচ্ছভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মূলত সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয়ের এই বিতর্কিত প্রচলন শুরু হয়।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী জানান, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সিএসআর করার কোনো সুযোগ বা আইনি ভিত্তি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত করপোরেট সেক্টর তাদের লাভের একটি অংশ সমাজকল্যাণে ব্যয় করে, কিন্তু বিএসইসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধান নেই। সাবেক কমিশনার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী একে চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিএসআর করতে পারলেও বিএসইসির মতো অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং এটি শিবলী রুবাইয়াতের আমলের একটি অনিয়ম।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএসইসি নিয়মিতভাবে সিএসআর খাতে অর্থ ব্যয় করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঁচ কোটি টাকা, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশেষায়িত হাসপাতালে এক কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বিএসইসির নিজস্ব ভবনের ছাদে মসজিদ ও স্পোর্টস জোন নির্মাণের জন্য বিএসইসির অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে এক কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ। এছাড়া সাকিব আল হাসানকে শুভেচ্ছা দূত থাকাকালীন মাগুরা সদর হাসপাতালে সহায়তার জন্য ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে বিএসইসির শুভেচ্ছা দূত হন ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।

ব্যয় পর্যালোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠনের প্রতি বিশেষ প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। ঢাবি কেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, বনভোজন এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাবদ ৩২ লাখ ৫৯ হাজার টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিএসইসির কর্মচারী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা সহায়তা এবং উৎসব বোনাস হিসেবেও সিএসআর তহবিল থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বরিশালের বাকেরগঞ্জে বিভিন্ন কবরস্থান, মসজিদ ও ঈদগাহ উন্নয়নের জন্য কয়েক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা তৎকালীন কমিশনার আবদুল হালিমের নিজ এলাকা হওয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। তবে আবদুল হালিম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, আবেদন যাচাই-বাছাই করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সিএসআর খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাত কোটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, প্রতিটি ব্যয় কমিশন সভায় অনুমোদিত এবং বর্তমানে এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। অন্যদিকে রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিএসইসির আইনে সিএসআর ব্যয়ের কোনো বিধান না থাকায় এই ব্যয় আইনবহির্ভূত।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালানোর পর ১০ আগস্ট বিএসইসির চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগ করেন শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম। শেয়ারবাজারে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, কারসাজি, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের মামলায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তার সময়ে সিএসআর ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন অপর কমিশনার ড. মিজানুর রহমান জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত তার মনে নেই। এছাড়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনও বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান দিয়েছিল, তবে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।