লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিসিএসের মোহে বন্দি মেধা: উচ্চশিক্ষার সংকট ও আমাদের বাস্তবতা

সকাল ৮টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, শিক্ষার্থীরা গবেষণা বা নতুন জ্ঞানের সন্ধানে ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু কাছে গেলেই অন্য এক বাস্তবতা ফুটে ওঠে—অধিকাংশের হাতে গবেষণাপত্র নয়, বরং মোটা মোটা বিসিএস প্রিলিমিনারি গাইড। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের প্রায় সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একই চিত্র দেখা যায়। অনার্সের প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লক্ষ্যের চেয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতির দিকে ঝোঁক বেশি থাকে। উদ্ভাবন, দক্ষতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বয়সে তারা মুখস্থনির্ভর এক প্রতিযোগিতায় নিজেদের আটকে ফেলছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের সমাজে বিসিএস এখন কেবল একটি চাকরি নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক। একজন ব্যক্তির মূল্যায়নে এখনো পদমর্যাদাই প্রধান মানদণ্ড। করপোরেট খাত বা উদ্যোক্তা হিসেবে বড় সাফল্য অর্জন করলেও সামাজিক ও পারিবারিক আড্ডায় বিসিএস ক্যাডারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এই মানসিক চাপই তরুণদের মুখস্থনির্ভর এই প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে দেশের মেধা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী যখন নিজের বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চা ছেড়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়াকে লক্ষ্য বানান, তখন রাষ্ট্রের শিক্ষা বিনিয়োগের সুফল ব্যাহত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র প্রয়োজন, কিন্তু বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তার অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রবণতার জন্য কেবল তরুণদের দায়ী করা কঠিন, কারণ এর পেছনে রয়েছে দেশের কঠিন অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা। বেসরকারি খাতে এখনো পর্যাপ্ত চাকরির নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। বিপরীতে সরকারি চাকরিতে স্থায়িত্ব, মোটা অঙ্কের বেতন, আবাসন, চিকিৎসা ও পেনশনের সুবিধা বিদ্যমান। এছাড়া পুঁজিবাজারের অস্থিরতা ও সীমিত শিল্পায়নের কারণে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে বিসিএস অনেকের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে উচ্চ সুদের ঋণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক জটিলতা তরুণদের সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি খাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি; সফলতার মানদণ্ড হিসেবে কেবল সরকারি চাকরিকে না দেখে মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার তরুণদের স্বপ্নের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করে। যদি সব মেধা একটিমাত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা পুরো রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতির কারণ। বিসিএস একটি সম্মানজনক পেশা হলেও, দেশের সব মেধার গন্তব্য কখনোই একটিমাত্র চাকরি হতে পারে না।

নেদারল্যান্ডস উপকূলে ৩৮ অভিবাসীসহ ইঞ্জিনবিহীন রাবারের নৌকা উদ্ধার

বিসিএসের মোহে বন্দি মেধা: উচ্চশিক্ষার সংকট ও আমাদের বাস্তবতা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:০২:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সকাল ৮টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, শিক্ষার্থীরা গবেষণা বা নতুন জ্ঞানের সন্ধানে ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু কাছে গেলেই অন্য এক বাস্তবতা ফুটে ওঠে—অধিকাংশের হাতে গবেষণাপত্র নয়, বরং মোটা মোটা বিসিএস প্রিলিমিনারি গাইড। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের প্রায় সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একই চিত্র দেখা যায়। অনার্সের প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লক্ষ্যের চেয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতির দিকে ঝোঁক বেশি থাকে। উদ্ভাবন, দক্ষতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বয়সে তারা মুখস্থনির্ভর এক প্রতিযোগিতায় নিজেদের আটকে ফেলছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের সমাজে বিসিএস এখন কেবল একটি চাকরি নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক। একজন ব্যক্তির মূল্যায়নে এখনো পদমর্যাদাই প্রধান মানদণ্ড। করপোরেট খাত বা উদ্যোক্তা হিসেবে বড় সাফল্য অর্জন করলেও সামাজিক ও পারিবারিক আড্ডায় বিসিএস ক্যাডারের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। এই মানসিক চাপই তরুণদের মুখস্থনির্ভর এই প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে দেশের মেধা ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী যখন নিজের বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চা ছেড়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়াকে লক্ষ্য বানান, তখন রাষ্ট্রের শিক্ষা বিনিয়োগের সুফল ব্যাহত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র প্রয়োজন, কিন্তু বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তার অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রবণতার জন্য কেবল তরুণদের দায়ী করা কঠিন, কারণ এর পেছনে রয়েছে দেশের কঠিন অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতা। বেসরকারি খাতে এখনো পর্যাপ্ত চাকরির নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। বিপরীতে সরকারি চাকরিতে স্থায়িত্ব, মোটা অঙ্কের বেতন, আবাসন, চিকিৎসা ও পেনশনের সুবিধা বিদ্যমান। এছাড়া পুঁজিবাজারের অস্থিরতা ও সীমিত শিল্পায়নের কারণে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে বিসিএস অনেকের কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে উচ্চ সুদের ঋণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক জটিলতা তরুণদের সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি খাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি; সফলতার মানদণ্ড হিসেবে কেবল সরকারি চাকরিকে না দেখে মেধা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার তরুণদের স্বপ্নের বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করে। যদি সব মেধা একটিমাত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা পুরো রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতির কারণ। বিসিএস একটি সম্মানজনক পেশা হলেও, দেশের সব মেধার গন্তব্য কখনোই একটিমাত্র চাকরি হতে পারে না।