লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে ভয়াবহ দাঙ্গা ও লুটপাট: রাজনৈতিক সংকটের মুখে ম্যাক্রোঁ সরকার

ফ্রান্সে সপ্তাহজুড়ে চলা ব্যাপক দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে শত শত মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিভক্তি ও অর্থনৈতিক সংকটের চক্রে আটকা পড়েছে দেশটি।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সোমবার স্বীকার করেছেন যে, দেশটিতে বর্তমানে এক বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তার এই মন্তব্যও পরিস্থিতির গভীরতাকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে চলা দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ফলে শত শত মিলিয়ন ডলারের সম্পদের ক্ষতি ও চুরির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফ্রান্স বর্তমানে নগরকেন্দ্রিক বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক সংকটের এক বিষাক্ত চক্রে আবর্তিত হচ্ছে।

সহিংসতা প্যারিস, মার্সেই এবং বোর্দোসহ বড় বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। লিমোজ শহরের সিটি হল ভবনটি আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ঘড়িসংবলিত চূড়াটি ধসে পড়েছে। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এতে ফরাসি শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন, যারা স্কুলের বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ।

সহিংসতা দমনে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত শিক্ষাবর্ষের শুরুতে স্কুলকেন্দ্রিক বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে গ্রেফতারের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে এবং শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী নভেম্বরে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে এবং আগামী সপ্তাহেও নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অসন্তোষ ফ্রান্সের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কট্টর ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লো পেন জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।

রাজনীতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের খেলা। কট্টর বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জিন-লুক মেলেশোঁ পুলিশের কৌশলের সমালোচনা করে সরকারকে বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যারা সহিংসতা ঘটাচ্ছে, তাদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায় না এবং এটি তাদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।

ন্যাশনাল র্যালি দলের প্রার্থী মেরিন লো পেন পরিস্থিতিকে পুঁজি করে অভিবাসন ইস্যুকে সামনে এনেছেন। তার অভিযোগ, শহরতলির অপরাধপ্রবণ এলাকা থেকে আসা অপরাধীরাই এই সহিংসতার জন্য দায়ী। দলের সভাপতি জর্দান বারদেলাও অ্যান্টিফা মিলিশিয়া, কট্টর বামপন্থি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীর সদস্যরা সাধারণত পরিচয় গোপন রাখতে কালো পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিভক্তি এই সংকটের মূলে রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর আগাম নির্বাচন আহ্বানের সিদ্ধান্ত উল্টো ফল বয়ে এনেছে এবং পার্লামেন্ট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। মধ্যপন্থি রাজনৈতিক বলয় বিলীন হয়ে যাওয়ায় ন্যাশনাল র্যালি এবং মেলেশোঁর ফ্রান্স আনবোড দল জনক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের অধ্যাপক রবার্ট জারেটস্কি আটলান্টিক সাময়িকীতে লিখেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ ফ্রান্সের গণতন্ত্রের জন্য বড় বিপদ। ইপসোস-বিভিএর জনমত জরিপে উঠে এসেছে, ৯৮ শতাংশ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং ৮৫ শতাংশ মনে করছেন দেশটির অবনতি ঘটছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মামলা করে দেন, জেলে যাবো: নাহিদকে চ্যালেঞ্জ ইশরাক হোসেনের

ফ্রান্সে ভয়াবহ দাঙ্গা ও লুটপাট: রাজনৈতিক সংকটের মুখে ম্যাক্রোঁ সরকার

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:৩১:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সোমবার স্বীকার করেছেন যে, দেশটিতে বর্তমানে এক বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তার এই মন্তব্যও পরিস্থিতির গভীরতাকে পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে চলা দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ফলে শত শত মিলিয়ন ডলারের সম্পদের ক্ষতি ও চুরির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফ্রান্স বর্তমানে নগরকেন্দ্রিক বিদ্রোহ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক সংকটের এক বিষাক্ত চক্রে আবর্তিত হচ্ছে।

সহিংসতা প্যারিস, মার্সেই এবং বোর্দোসহ বড় বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। লিমোজ শহরের সিটি হল ভবনটি আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ঘড়িসংবলিত চূড়াটি ধসে পড়েছে। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এতে ফরাসি শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন, যারা স্কুলের বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ।

সহিংসতা দমনে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত শিক্ষাবর্ষের শুরুতে স্কুলকেন্দ্রিক বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে গ্রেফতারের সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়েছে এবং শতাধিক স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী নভেম্বরে ধর্মঘটের পরিকল্পনা করছে এবং আগামী সপ্তাহেও নতুন করে বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অসন্তোষ ফ্রান্সের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কট্টর ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লো পেন জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।

রাজনীতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের খেলা। কট্টর বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জিন-লুক মেলেশোঁ পুলিশের কৌশলের সমালোচনা করে সরকারকে বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে যারা সহিংসতা ঘটাচ্ছে, তাদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায় না এবং এটি তাদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।

ন্যাশনাল র্যালি দলের প্রার্থী মেরিন লো পেন পরিস্থিতিকে পুঁজি করে অভিবাসন ইস্যুকে সামনে এনেছেন। তার অভিযোগ, শহরতলির অপরাধপ্রবণ এলাকা থেকে আসা অপরাধীরাই এই সহিংসতার জন্য দায়ী। দলের সভাপতি জর্দান বারদেলাও অ্যান্টিফা মিলিশিয়া, কট্টর বামপন্থি উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ব্ল্যাক ব্লক গোষ্ঠীর সদস্যরা সাধারণত পরিচয় গোপন রাখতে কালো পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিভক্তি এই সংকটের মূলে রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর আগাম নির্বাচন আহ্বানের সিদ্ধান্ত উল্টো ফল বয়ে এনেছে এবং পার্লামেন্ট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। মধ্যপন্থি রাজনৈতিক বলয় বিলীন হয়ে যাওয়ায় ন্যাশনাল র্যালি এবং মেলেশোঁর ফ্রান্স আনবোড দল জনক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের অধ্যাপক রবার্ট জারেটস্কি আটলান্টিক সাময়িকীতে লিখেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ ফ্রান্সের গণতন্ত্রের জন্য বড় বিপদ। ইপসোস-বিভিএর জনমত জরিপে উঠে এসেছে, ৯৮ শতাংশ মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং ৮৫ শতাংশ মনে করছেন দেশটির অবনতি ঘটছে।