লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠালি: শত বছরের স্বাদের এক অনন্য নাম

বাংলার গ্রামীণ জনপদে এমন কিছু খাবার রয়েছে যা কেবল রসনা তৃপ্তির মাধ্যম নয়, বরং তা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। জামালপুরের ক্ষেত্রে তেমনই একটি নাম হলো পিঠালি। গরু, খাসি কিংবা মহিষের মাংসের সাথে চালের গুঁড়া ও বিভিন্ন মসলার সংমিশ্রণে তৈরি এই ঘন ও সুস্বাদু খাবারটি স্থানীয়ভাবে মিল্লি, মিলানি, ম্যান্দা বা মেন্দা নামেও পরিচিত। যদিও নামের ভিন্নতা রয়েছে, তবে মূল খাবারটি একই।

পিঠালির সঠিক উৎপত্তি বা প্রচলনের সময়কাল নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই। তবে স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আঠারো শতকের দিকে জামালপুরের চরাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপনের সাথে সাথে সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নের অংশ হিসেবে এই রান্নার প্রচলন শুরু হয়। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে জামালপুরের মানুষ এই ঐতিহ্যকে সযত্নে ধরে রেখেছেন।

পিঠালি রান্নার মূল উপকরণ হলো মাংস, চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা ও অন্যান্য মসলা। মাংস কষিয়ে তাতে পানি দেওয়ার পর চালের গুঁড়া মিশিয়ে রান্না করা হয়, যা ঝোলকে ঘন ও আঠালো করে তোলে। রান্নার শেষ পর্যায়ে পেঁয়াজ, রসুন ও জিরার ফোড়ন বা বাগাড় দেওয়া হয়, যা খাবারটির স্বাদ ও সুগন্ধ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মাংসের ঝোলের চেয়ে এর স্বাদ ও গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনেকটা হালিমের মতো ঘন।

জামালপুরে পিঠালি প্রতিদিনের খাবার নয়, বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজনের বিশেষ পদ। বিয়ে, আকিকা, খতনা, মিলাদ কিংবা মৃত্যুর পর ৪০ দিনের দোয়া ও খাবারের অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করা হয়। জামালপুরে মৃত্যুর পর প্রায় ৪০ দিনের যে দোয়া ও খাবারের আয়োজন করা হয়, স্থানীয়ভাবে সেটিকে অনেক জায়গায় ‘বেপার’ বলা হয়। বড় আয়োজনে কলাপাতায় সারিবদ্ধভাবে বসে গরম ভাতের সাথে পিঠালি খাওয়ার রীতি জামালপুরের সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।

স্থানীয়দের মতে, ঘরে রান্না করা পিঠালির চেয়ে নিমন্ত্রণ বাড়ির পিঠালির স্বাদ বেশি। এর কারণ হিসেবে বড় হাঁড়িতে একসাথে অনেক মানুষের জন্য রান্না করার কৌশলকে দায়ী করা হয়, যেখানে মসলা ও মাংসের স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়। জামালপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পিঠালির সাথে সাদা ভাত ও মাশকলাইয়ের ডাল পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে শেষে দই-মিষ্টিও থাকে।

সময়ের পরিবর্তনে খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন এলেও জামালপুরের মানুষের কাছে পিঠালির জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও খাদ্য উৎসবে পিঠালিকে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবীণ রাঁধুনিদের কাছ থেকে এর সঠিক রান্নার পদ্ধতি নথিভুক্ত করা জরুরি। গরম ভাতের সাথে মিশে থাকা পিঠালির এই শত বছরের স্বাদ আজও জামালপুরের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা: জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান ১ দিনের রিমান্ডে

জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠালি: শত বছরের স্বাদের এক অনন্য নাম

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৩৬:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলার গ্রামীণ জনপদে এমন কিছু খাবার রয়েছে যা কেবল রসনা তৃপ্তির মাধ্যম নয়, বরং তা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। জামালপুরের ক্ষেত্রে তেমনই একটি নাম হলো পিঠালি। গরু, খাসি কিংবা মহিষের মাংসের সাথে চালের গুঁড়া ও বিভিন্ন মসলার সংমিশ্রণে তৈরি এই ঘন ও সুস্বাদু খাবারটি স্থানীয়ভাবে মিল্লি, মিলানি, ম্যান্দা বা মেন্দা নামেও পরিচিত। যদিও নামের ভিন্নতা রয়েছে, তবে মূল খাবারটি একই।

পিঠালির সঠিক উৎপত্তি বা প্রচলনের সময়কাল নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই। তবে স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আঠারো শতকের দিকে জামালপুরের চরাঞ্চলে মানুষের বসতি স্থাপনের সাথে সাথে সামাজিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নের অংশ হিসেবে এই রান্নার প্রচলন শুরু হয়। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে জামালপুরের মানুষ এই ঐতিহ্যকে সযত্নে ধরে রেখেছেন।

পিঠালি রান্নার মূল উপকরণ হলো মাংস, চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা ও অন্যান্য মসলা। মাংস কষিয়ে তাতে পানি দেওয়ার পর চালের গুঁড়া মিশিয়ে রান্না করা হয়, যা ঝোলকে ঘন ও আঠালো করে তোলে। রান্নার শেষ পর্যায়ে পেঁয়াজ, রসুন ও জিরার ফোড়ন বা বাগাড় দেওয়া হয়, যা খাবারটির স্বাদ ও সুগন্ধ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মাংসের ঝোলের চেয়ে এর স্বাদ ও গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন, অনেকটা হালিমের মতো ঘন।

জামালপুরে পিঠালি প্রতিদিনের খাবার নয়, বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজনের বিশেষ পদ। বিয়ে, আকিকা, খতনা, মিলাদ কিংবা মৃত্যুর পর ৪০ দিনের দোয়া ও খাবারের অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করা হয়। জামালপুরে মৃত্যুর পর প্রায় ৪০ দিনের যে দোয়া ও খাবারের আয়োজন করা হয়, স্থানীয়ভাবে সেটিকে অনেক জায়গায় ‘বেপার’ বলা হয়। বড় আয়োজনে কলাপাতায় সারিবদ্ধভাবে বসে গরম ভাতের সাথে পিঠালি খাওয়ার রীতি জামালপুরের সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।

স্থানীয়দের মতে, ঘরে রান্না করা পিঠালির চেয়ে নিমন্ত্রণ বাড়ির পিঠালির স্বাদ বেশি। এর কারণ হিসেবে বড় হাঁড়িতে একসাথে অনেক মানুষের জন্য রান্না করার কৌশলকে দায়ী করা হয়, যেখানে মসলা ও মাংসের স্বাদ ভালোভাবে মিশে যায়। জামালপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পিঠালির সাথে সাদা ভাত ও মাশকলাইয়ের ডাল পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে শেষে দই-মিষ্টিও থাকে।

সময়ের পরিবর্তনে খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন এলেও জামালপুরের মানুষের কাছে পিঠালির জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও খাদ্য উৎসবে পিঠালিকে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবীণ রাঁধুনিদের কাছ থেকে এর সঠিক রান্নার পদ্ধতি নথিভুক্ত করা জরুরি। গরম ভাতের সাথে মিশে থাকা পিঠালির এই শত বছরের স্বাদ আজও জামালপুরের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।