লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বামীকে সম্মান দিয়ে নিজে ‘রাণী’ হওয়ার আসল রহস্য কী?

দাম্পত্য জীবনে ক্ষমতার লড়াই এড়িয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সুন্দর রূপক হলো স্বামীকে ‘রাজা’ বানিয়ে নিজে ‘রাণী’ হওয়া। এটি কোনোভাবেই নিজের অধিকার বিসর্জন দেওয়া বা অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং স্বামীর ইতিবাচক গুণগুলোকে উৎসাহিত করে সংসারের ভিত শক্ত করার একটি কৌশল। একজন বিচক্ষণ স্ত্রী স্বামীর সাফল্যকে নিজের পরিবারের সাফল্য হিসেবে দেখেন এবং যেকোনো ভালো সিদ্ধান্তে তাকে সমর্থন দেন। একইভাবে, একজন ভালো স্বামী যখন স্ত্রীর স্বপ্ন, মতামত ও আত্মসম্মানকে মূল্য দেন, তখন সম্পর্কটি একতরফা না থেকে পারস্পরিক শক্তিতে রূপ নেয়।

২০০৮ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় গবেষক রেবেকা এল ব্রক (Rebecca L. Brock), এরিকা লরেন্স (Erika Lawrence) এবং তাঁদের সহযোগীরা ১০১টি নবদম্পতিকে তিন বছর ধরে চার দফায় পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত দাম্পত্য সহায়তা, বিশেষ করে স্ত্রীর পক্ষ থেকে পাওয়া সমর্থন, দাম্পত্য সন্তুষ্টি বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে স্বামীকে মানসিকভাবে শক্তি জোগানো কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের স্থায়িত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

দাম্পত্যে সম্মানের শক্তি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বুদ্ধিমতী স্ত্রীরা স্বামীর ভালো কাজের প্রশংসা করেন এবং কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান। তবে ভুল হলে সবার সামনে অপমান না করে ব্যক্তিগতভাবে তা সংশোধন করার সুযোগ দেওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া-এর (University of Iowa) এরিকা লরেন্স ও তাঁর সহকর্মীরা ২৭৫টি বিবাহিত দম্পতিকে নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন, যা ‘পার্সোনাল রিলেশনশিপস’ (Personal Relationships) জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সঙ্গীকে কত বেশি সাহায্য করা হচ্ছে তার চেয়ে সেই সাহায্য কতটা সময়োপযোগী ও উপযুক্ত ছিল, তা দাম্পত্য সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, কখন কীভাবে সঙ্গীর পাশে দাঁড়াতে হবে তা বুঝতে পারাই প্রকৃত দাম্পত্য বুদ্ধিমত্তা।

প্রকৃত অর্থে ‘রাণী’ হওয়া মানে নিজের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে স্বামীকে সম্মান জানানো। একজন বুদ্ধিমতী নারী স্বামীর প্রতিটি সিদ্ধান্তে অন্ধভাবে সায় দেন না, বরং ভুল সিদ্ধান্তে শান্তভাবে নিজের দ্বিমত প্রকাশ করেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পাশে থাকেন। ২০১৪ সালে জেফরি বি জ্যাকসন (Jeffrey B. Jackson) এবং তাঁর সহকর্মীরা ২২৬টি স্বাধীন নমুনা এবং মোট ১,০১,১১০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে একটি মেটা-অ্যানালাইসিস বা যৌথ বিশ্লেষণ করেন। ‘জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি’ (Journal of Marriage and Family)-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, স্বামী ও স্ত্রীর দাম্পত্য সন্তুষ্টির মধ্যকার পার্থক্য অত্যন্ত সামান্য। এর অর্থ হলো, দাম্পত্য সুখ কেবল কোনো একজনের একক আচরণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

সংসার পরিচালনায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্বামীর কোনো ভুল নিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে অভিযোগ করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা সবার সামনে তাঁকে ছোট করা সম্পর্কের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। সাময়িক ক্ষোভ মেটাতে স্বামীকে অপমান করলে দীর্ঘমেয়াদে দূরত্ব বাড়ে। ২০১৫ সালে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অব নার্সিং-এর (Johns Hopkins University School of Nursing) নোয়েল এম সেন্ট ভিল (Noelle M. St. Vil) ‘জার্নাল অব ফ্যামিলি সোশ্যাল ওয়ার্ক’ (Journal of Family Social Work)-এ একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি পারস্পরিক সহায়তা, আবেগগত সমর্থন এবং দাম্পত্য সন্তুষ্টির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তবে দাম্পত্য বুদ্ধিমত্তা মানে কখনোই অন্যায়, নির্যাতন বা অসম্মানকে মুখ বুজে সহ্য করা নয়। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো কোথায় স্বামীকে উৎসাহ দিতে হবে, কোথায় নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দুজনে মিলে যৌথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারা। দিনশেষে একটি সুখী সংসার কেবল ভালোবাসায় টিকে থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান, সহযোগিতা ও বিচক্ষণতা। যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযাত্রী হয়ে ওঠেন, সেখানেই দাম্পত্যের আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর অভিযানে ৭ শতাধিক হুথি যোদ্ধা নিহত

স্বামীকে সম্মান দিয়ে নিজে ‘রাণী’ হওয়ার আসল রহস্য কী?

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:৪০:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

দাম্পত্য জীবনে ক্ষমতার লড়াই এড়িয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সুন্দর রূপক হলো স্বামীকে ‘রাজা’ বানিয়ে নিজে ‘রাণী’ হওয়া। এটি কোনোভাবেই নিজের অধিকার বিসর্জন দেওয়া বা অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং স্বামীর ইতিবাচক গুণগুলোকে উৎসাহিত করে সংসারের ভিত শক্ত করার একটি কৌশল। একজন বিচক্ষণ স্ত্রী স্বামীর সাফল্যকে নিজের পরিবারের সাফল্য হিসেবে দেখেন এবং যেকোনো ভালো সিদ্ধান্তে তাকে সমর্থন দেন। একইভাবে, একজন ভালো স্বামী যখন স্ত্রীর স্বপ্ন, মতামত ও আত্মসম্মানকে মূল্য দেন, তখন সম্পর্কটি একতরফা না থেকে পারস্পরিক শক্তিতে রূপ নেয়।

২০০৮ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় গবেষক রেবেকা এল ব্রক (Rebecca L. Brock), এরিকা লরেন্স (Erika Lawrence) এবং তাঁদের সহযোগীরা ১০১টি নবদম্পতিকে তিন বছর ধরে চার দফায় পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত দাম্পত্য সহায়তা, বিশেষ করে স্ত্রীর পক্ষ থেকে পাওয়া সমর্থন, দাম্পত্য সন্তুষ্টি বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে স্বামীকে মানসিকভাবে শক্তি জোগানো কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের স্থায়িত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

দাম্পত্যে সম্মানের শক্তি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বুদ্ধিমতী স্ত্রীরা স্বামীর ভালো কাজের প্রশংসা করেন এবং কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান। তবে ভুল হলে সবার সামনে অপমান না করে ব্যক্তিগতভাবে তা সংশোধন করার সুযোগ দেওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া-এর (University of Iowa) এরিকা লরেন্স ও তাঁর সহকর্মীরা ২৭৫টি বিবাহিত দম্পতিকে নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন, যা ‘পার্সোনাল রিলেশনশিপস’ (Personal Relationships) জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, সঙ্গীকে কত বেশি সাহায্য করা হচ্ছে তার চেয়ে সেই সাহায্য কতটা সময়োপযোগী ও উপযুক্ত ছিল, তা দাম্পত্য সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, কখন কীভাবে সঙ্গীর পাশে দাঁড়াতে হবে তা বুঝতে পারাই প্রকৃত দাম্পত্য বুদ্ধিমত্তা।

প্রকৃত অর্থে ‘রাণী’ হওয়া মানে নিজের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে স্বামীকে সম্মান জানানো। একজন বুদ্ধিমতী নারী স্বামীর প্রতিটি সিদ্ধান্তে অন্ধভাবে সায় দেন না, বরং ভুল সিদ্ধান্তে শান্তভাবে নিজের দ্বিমত প্রকাশ করেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পাশে থাকেন। ২০১৪ সালে জেফরি বি জ্যাকসন (Jeffrey B. Jackson) এবং তাঁর সহকর্মীরা ২২৬টি স্বাধীন নমুনা এবং মোট ১,০১,১১০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে একটি মেটা-অ্যানালাইসিস বা যৌথ বিশ্লেষণ করেন। ‘জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি’ (Journal of Marriage and Family)-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, স্বামী ও স্ত্রীর দাম্পত্য সন্তুষ্টির মধ্যকার পার্থক্য অত্যন্ত সামান্য। এর অর্থ হলো, দাম্পত্য সুখ কেবল কোনো একজনের একক আচরণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

সংসার পরিচালনায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্বামীর কোনো ভুল নিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে অভিযোগ করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা বা সবার সামনে তাঁকে ছোট করা সম্পর্কের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। সাময়িক ক্ষোভ মেটাতে স্বামীকে অপমান করলে দীর্ঘমেয়াদে দূরত্ব বাড়ে। ২০১৫ সালে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অব নার্সিং-এর (Johns Hopkins University School of Nursing) নোয়েল এম সেন্ট ভিল (Noelle M. St. Vil) ‘জার্নাল অব ফ্যামিলি সোশ্যাল ওয়ার্ক’ (Journal of Family Social Work)-এ একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি পারস্পরিক সহায়তা, আবেগগত সমর্থন এবং দাম্পত্য সন্তুষ্টির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তবে দাম্পত্য বুদ্ধিমত্তা মানে কখনোই অন্যায়, নির্যাতন বা অসম্মানকে মুখ বুজে সহ্য করা নয়। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো কোথায় স্বামীকে উৎসাহ দিতে হবে, কোথায় নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দুজনে মিলে যৌথ সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা সঠিকভাবে বুঝতে পারা। দিনশেষে একটি সুখী সংসার কেবল ভালোবাসায় টিকে থাকে না; এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান, সহযোগিতা ও বিচক্ষণতা। যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযাত্রী হয়ে ওঠেন, সেখানেই দাম্পত্যের আসল সাফল্য লুকিয়ে থাকে।