লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

র‍্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই ৩ হত্যাকাণ্ড দেখেন সাবেক মেজর সাজ্জাদ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‍্যাব) দায়িত্ব পালনের প্রথম রাতেই তিনটি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম। গত রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি এই সাক্ষ্য দেন।

তদন্ত সংস্থাকে দেওয়া জবানবন্দিতে খোন্দকার সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, তিনি ১৯৯২ সালে ২৬তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০১১ সালে সরকারি আদেশে তাকে র‍্যাবে বদলি করা হলে ওই বছরের ৫ জুলাই তিনি র‍্যাব সদর দপ্তরে যোগ দেন। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১১ জুলাই তাকে র‍্যাব-৩ এ পদায়ন করা হয়।

সাজ্জাদুল ইসলামের ভাষ্যমতে, র‍্যাব-৩ এ যোগদানের দিনই তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম তাকে জানান যে, রাতে তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশনায় একটি বিশেষ অভিযানে অংশ নিতে হবে। সেই অনুযায়ী রাত প্রায় ১১টার দিকে কয়েকটি গাড়িতে করে তারা র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে গাজীপুর-জয়দেবপুর এলাকার দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে একটি সেতুর ওপর পৌঁছানোর পর চোখ ও হাত বাঁধা এক ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। সাজ্জাদুলের অভিযোগ, সেখানে জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তির মাথার পেছনে গুলি করে মরদেহ সেতুর নিচে ফেলে দেন।

এরপর আরেকটি স্থানে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এর নামে অন্য একটি কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বলা হলে সাজ্জাদুল অভিযানের প্রকৃতি জানতে চান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়াউল আহসান তাকে ইংরেজিতে গালাগাল করেন এবং গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসার নির্দেশ দেন। সাজ্জাদুল তখন জানান, কাজটি বৈধ না হলে তিনি এতে অংশ নেবেন না। এর জবাবে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, ভয়ে তিনি গাড়ির ভেতরে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকেন। কিছুক্ষণ পর বাইরে গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। পরে আরেকটি স্থানে চোখ বাঁধা আরেক ব্যক্তিকে কয়েকজন সদস্য টেনে নিয়ে যেতে দেখলেও তাকে আর ফিরে আসতে দেখেননি। পুরো অভিযানে অন্তত তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে তার ধারণা হয়।

অভিযান শেষে গভীর রাতে সাজ্জাদুলকে ঢাকা সেনানিবাসের স্টাফ রোডে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন র‍্যাব-৩ এ যাওয়ার পথে তিনি জানতে পারেন, তাকে র‍্যাব থেকে প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীতে বদলি করা হয়েছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে সরাসরি কুমিল্লা সেনানিবাসের অর্ডন্যান্স ডিপোতে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়, এমনকি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেনা সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এর তিন-চার দিন পর জাতীয় দৈনিকে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে তিনটি গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের খবর দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, ওই রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছিল।

সাজ্জাদুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন, র‍্যাবের ওই ঘটনার পর সেনাবাহিনীতে তাকে ‘অবিশ্বস্ত’ ও ‘অবাধ্য’ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আর কোনো পদোন্নতি পাননি। অবশেষে চাকরির প্রায় ১২ বছর বাকি থাকতেই ২০১৩ সালে মেজর পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিতে বাধ্য হন।

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনার খবরে তেলের দাম হ্রাস

র‍্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই ৩ হত্যাকাণ্ড দেখেন সাবেক মেজর সাজ্জাদ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৫৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‍্যাব) দায়িত্ব পালনের প্রথম রাতেই তিনটি হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম। গত রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম ও হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি এই সাক্ষ্য দেন।

তদন্ত সংস্থাকে দেওয়া জবানবন্দিতে খোন্দকার সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, তিনি ১৯৯২ সালে ২৬তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ২০১১ সালে সরকারি আদেশে তাকে র‍্যাবে বদলি করা হলে ওই বছরের ৫ জুলাই তিনি র‍্যাব সদর দপ্তরে যোগ দেন। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১১ জুলাই তাকে র‍্যাব-৩ এ পদায়ন করা হয়।

সাজ্জাদুল ইসলামের ভাষ্যমতে, র‍্যাব-৩ এ যোগদানের দিনই তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম তাকে জানান যে, রাতে তৎকালীন গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশনায় একটি বিশেষ অভিযানে অংশ নিতে হবে। সেই অনুযায়ী রাত প্রায় ১১টার দিকে কয়েকটি গাড়িতে করে তারা র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে গাজীপুর-জয়দেবপুর এলাকার দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে একটি সেতুর ওপর পৌঁছানোর পর চোখ ও হাত বাঁধা এক ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। সাজ্জাদুলের অভিযোগ, সেখানে জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তির মাথার পেছনে গুলি করে মরদেহ সেতুর নিচে ফেলে দেন।

এরপর আরেকটি স্থানে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এর নামে অন্য একটি কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বলা হলে সাজ্জাদুল অভিযানের প্রকৃতি জানতে চান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়াউল আহসান তাকে ইংরেজিতে গালাগাল করেন এবং গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসার নির্দেশ দেন। সাজ্জাদুল তখন জানান, কাজটি বৈধ না হলে তিনি এতে অংশ নেবেন না। এর জবাবে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, ভয়ে তিনি গাড়ির ভেতরে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকেন। কিছুক্ষণ পর বাইরে গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। পরে আরেকটি স্থানে চোখ বাঁধা আরেক ব্যক্তিকে কয়েকজন সদস্য টেনে নিয়ে যেতে দেখলেও তাকে আর ফিরে আসতে দেখেননি। পুরো অভিযানে অন্তত তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে তার ধারণা হয়।

অভিযান শেষে গভীর রাতে সাজ্জাদুলকে ঢাকা সেনানিবাসের স্টাফ রোডে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন র‍্যাব-৩ এ যাওয়ার পথে তিনি জানতে পারেন, তাকে র‍্যাব থেকে প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীতে বদলি করা হয়েছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে সরাসরি কুমিল্লা সেনানিবাসের অর্ডন্যান্স ডিপোতে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়, এমনকি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেনা সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। এর তিন-চার দিন পর জাতীয় দৈনিকে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে তিনটি গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের খবর দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, ওই রাতেই তাদের হত্যা করা হয়েছিল।

সাজ্জাদুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন, র‍্যাবের ওই ঘটনার পর সেনাবাহিনীতে তাকে ‘অবিশ্বস্ত’ ও ‘অবাধ্য’ কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আর কোনো পদোন্নতি পাননি। অবশেষে চাকরির প্রায় ১২ বছর বাকি থাকতেই ২০১৩ সালে মেজর পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিতে বাধ্য হন।