লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৩:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনিয়মের অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচও থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ

আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। গত বুধবার ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা বার্তা সংস্থা রয়টার্স সরাসরি দেখেছে।

সায়মা ওয়াজেদ ২০২৩ সালের নভেম্বরে সদস্যদেশগুলোর ভোটে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্য এই পদের দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে প্রথম অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি এই অবৈতনিক ছুটিতেই ছিলেন।

ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন ভ্রমণের সময় আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে। তাঁর আইনজীবীদের পাঠানো গত ৩ জুলাইয়ের এক চিঠিতে জানা যায়, ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক প্রতারণা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। এ ছাড়া পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ উল্লেখ করেছেন, ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি সরকারি প্লট অবৈধভাবে নেওয়ার অভিযোগও তুলেছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্লট প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন।

ডব্লিউএইচওর প্রধানের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু মহাপরিচালক তাঁকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে চলেছেন অভিযোগ করে তিনি লেখেন, ‘যেহেতু আপনি দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে আমাকে বাধা দিয়ে চলেছেন, তাই ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।’ একই সঙ্গে বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠানোর পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলেও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল যে সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে আছেন। এর আগে জুলাইয়ে ডব্লিউএইচওকে দেওয়া এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, নিয়মিত ভ্রমণ খরচ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে ৯০কার্ডের এই অসংগতি তৈরি হয়েছিল, যার পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ জানান, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রির বিষয়টি তিনি আগেই ডব্লিউএইচও প্রধানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা করছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, আগামী ১২ অক্টোবর এই পদের জন্য নতুন মনোনয়ন ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকেরা অত্যন্ত প্রভাবশালী নীতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করেন, যাদের কাজ হলো রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর এই পরিচালক নির্বাচন করে থাকে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদের এই পদত্যাগ শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসা রাজনৈতিক সংকটের সর্বশেষ উদাহরণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

চবি খালেদা জিয়া হলে পাঁচ শতাধিক ছাত্রীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা

অনিয়মের অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচও থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:১১:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। গত বুধবার ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা বার্তা সংস্থা রয়টার্স সরাসরি দেখেছে।

সায়মা ওয়াজেদ ২০২৩ সালের নভেম্বরে সদস্যদেশগুলোর ভোটে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্য এই পদের দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে প্রথম অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় ডব্লিউএইচও। পদত্যাগের আগপর্যন্ত তিনি এই অবৈতনিক ছুটিতেই ছিলেন।

ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন ভ্রমণের সময় আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে। তাঁর আইনজীবীদের পাঠানো গত ৩ জুলাইয়ের এক চিঠিতে জানা যায়, ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক প্রতারণা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। এ ছাড়া পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ উল্লেখ করেছেন, ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি সরকারি প্লট অবৈধভাবে নেওয়ার অভিযোগও তুলেছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্লট প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন।

ডব্লিউএইচওর প্রধানের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ লিখেছেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু মহাপরিচালক তাঁকে দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়ে চলেছেন অভিযোগ করে তিনি লেখেন, ‘যেহেতু আপনি দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে আমাকে বাধা দিয়ে চলেছেন, তাই ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর আমার সব আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।’ একই সঙ্গে বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠানোর পর প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলেও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল যে সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে আছেন। এর আগে জুলাইয়ে ডব্লিউএইচওকে দেওয়া এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, নিয়মিত ভ্রমণ খরচ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে ৯০কার্ডের এই অসংগতি তৈরি হয়েছিল, যার পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগের জবাবে সায়মা ওয়াজেদ জানান, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রির বিষয়টি তিনি আগেই ডব্লিউএইচও প্রধানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা করছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, আগামী ১২ অক্টোবর এই পদের জন্য নতুন মনোনয়ন ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকেরা অত্যন্ত প্রভাবশালী নীতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করেন, যাদের কাজ হলো রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর এই পরিচালক নির্বাচন করে থাকে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদের এই পদত্যাগ শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসা রাজনৈতিক সংকটের সর্বশেষ উদাহরণ।