লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বের প্রথম এআই শিল্প জাদুঘর ‘ডেটাল্যান্ড’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিপুল তথ্যের (ডেটা) সমন্বয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে গড়ে উঠেছে বিশ্বের প্রথম এআই-ভিত্তিক শিল্প জাদুঘর ‘ডেটাল্যান্ড’ (ডাটাল্যান্ড)। বিখ্যাত স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেহরির নকশা করা ‘গ্র্যান্ড এলএ’ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউতে এটি অবস্থিত। নামী শিল্পী রেফিক আনাদোলের দূরদর্শী ভাবনায় তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রযুক্তি, প্রকৃতি এবং মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। ঠিক বিপরীত দিকে থাকা গেহরির বিখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই জাদুঘরটি যেন এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

ডেটাল্যান্ডকে আনাদোল বর্ণনা করেছেন একটি “কল্পনার গবেষণাগার” হিসেবে। এখানে নেই কোনো সাধারণ ক্যানভাস বা ফ্রেম; বরং প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত হয়েছে অর্ধশত কোটিরও বেশি পিক্সেল। স্মিথসোনিয়ান এবং গেটির মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগৃহীত বিপুল তথ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রকৃতি, মানবদেহ এবং জীবনের নানা রূপ। তবে এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে দর্শকরা কেবল শিল্প দেখেন না, বরং নিজেরাও সেই শিল্পের একটি সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন।

এই জাদুঘরে প্রবেশ করতে হলে দর্শকদের হাতে পরতে হয় একটি বিশেষ ব্যান্ড, যা তাদের হৃদস্পন্দন ও শরীরের অন্যান্য প্রতিক্রিয়া মেপে নেয়। এই শারীরিক তথ্য সরাসরি প্রবেশ করে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে। একই সঙ্গে গলার কাছে থাকা একটি বিশেষ যন্ত্র থেকে ভেসে আসে বিভিন্ন সুগন্ধ, যা দর্শকের শারীরিক পরিবর্তন অনুযায়ী বদলে যায়। কয়েক হাজার বছরের নীরব শিল্পের ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আনাদোল প্রশ্ন তুলেছেন—যদি শিল্পকর্মও আমাদের অনুভূতি বুঝতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে কেমন হবে? তখন শিল্প আর নিস্তব্ধ বস্তু থাকে না, হয়ে ওঠে এক জীবন্ত সঙ্গী।

ডেটাল্যান্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় সৃষ্টি হলো ‘মেশিন ড্রিমস; রেইনফরেস্ট’। আমাজন সফরের সময় আনাদোল সেখানকার ইয়াওয়ানাওয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেখানে একটি হামিংবার্ড পাখি নিয়ে তাঁর দেখা স্বপ্নই এই কাজের মূল ভিত্তি। এই পাখির মাধ্যমে প্রকৃতির নিজস্ব স্মৃতিকে তাঁর ‘লার্জ নেচার মডেল’-এর ডেটার সাহায্যে দৃশ্যমান করা হয়েছে। তবে এখানে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্নও উঠে আসে—প্রকৃতিকে যখন ডেটায় রূপান্তর করা হয়, তখন কি আমরা আসলেই তাকে বুঝতে পারি, নাকি কেবল তার একটি অনুবাদ তৈরি করি? একটি অরণ্য কি শুধু তার গাছের সংখ্যা বা একটি নদী কি শুধু তার প্রবাহের পরিসংখ্যান?

জাদুঘরটির ‘ইনফিনিটি রুম’ এই প্রশ্নগুলোকে আরও জীবন্ত করে তোলে। আয়না, আলো, শব্দ, সুগন্ধ এবং এআই-এর তৈরি পরিবর্তনশীল ছবির সমন্বয়ে দর্শকরা এখানে নিজেদের শরীরের সীমানা হারিয়ে ফেলেন। এক মুহূর্তে মনে হতে পারে আপনি কোনো গভীর বনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর পরের মুহূর্তেই সেই বন ভেঙে আলো আর ডেটার এক অচেনা স্বপ্নে পরিণত হয়। এই শিল্পকর্মে ইয়াইয়ি কুসামা, ড্যান ফ্লাভিন এবং জেমস টারেলের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের প্রভাব স্পষ্ট, যারা একসময় আলো ও স্থান নিয়ে কাজ করেছিলেন।

তবে প্রযুক্তিই ডেটাল্যান্ডের একমাত্র বিস্ময় নয়। এফসুন এরকিলিচের মতে, একটি বন নিজেই এক পরম বিস্ময় এবং মানুষের কাজ হলো সেই বিস্ময়কে নতুন করে দেখতে শেখা। এই কারণেই ডেটাল্যান্ড দর্শকদের অনুরোধ করে প্রদর্শনী দেখার সময় তাদের ফোন নামিয়ে রাখতে, যাতে তারা ছবি তোলার চেয়ে শিল্পের ভেতরে কিছুক্ষণ বাঁচতে পারেন। এখানে হাজার বছরের পুরোনো প্রশ্ন “এই শিল্প আমাকে কী অনুভব করায়?” বদলে গিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়— “আমি যখন অনুভব করি, তখন শিল্পটি কেমন হয়ে ওঠে?”

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগ ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতির কোমর ভেঙে দিয়েছে: আন্দালিব রহমান পার্থ

লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বের প্রথম এআই শিল্প জাদুঘর ‘ডেটাল্যান্ড’

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৪২:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিপুল তথ্যের (ডেটা) সমন্বয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে গড়ে উঠেছে বিশ্বের প্রথম এআই-ভিত্তিক শিল্প জাদুঘর ‘ডেটাল্যান্ড’ (ডাটাল্যান্ড)। বিখ্যাত স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেহরির নকশা করা ‘গ্র্যান্ড এলএ’ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে ডাউনটাউন লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্র্যান্ড অ্যাভিনিউতে এটি অবস্থিত। নামী শিল্পী রেফিক আনাদোলের দূরদর্শী ভাবনায় তৈরি এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রযুক্তি, প্রকৃতি এবং মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। ঠিক বিপরীত দিকে থাকা গেহরির বিখ্যাত ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই জাদুঘরটি যেন এক নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

ডেটাল্যান্ডকে আনাদোল বর্ণনা করেছেন একটি “কল্পনার গবেষণাগার” হিসেবে। এখানে নেই কোনো সাধারণ ক্যানভাস বা ফ্রেম; বরং প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত হয়েছে অর্ধশত কোটিরও বেশি পিক্সেল। স্মিথসোনিয়ান এবং গেটির মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগৃহীত বিপুল তথ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রকৃতি, মানবদেহ এবং জীবনের নানা রূপ। তবে এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে দর্শকরা কেবল শিল্প দেখেন না, বরং নিজেরাও সেই শিল্পের একটি সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন।

এই জাদুঘরে প্রবেশ করতে হলে দর্শকদের হাতে পরতে হয় একটি বিশেষ ব্যান্ড, যা তাদের হৃদস্পন্দন ও শরীরের অন্যান্য প্রতিক্রিয়া মেপে নেয়। এই শারীরিক তথ্য সরাসরি প্রবেশ করে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে। একই সঙ্গে গলার কাছে থাকা একটি বিশেষ যন্ত্র থেকে ভেসে আসে বিভিন্ন সুগন্ধ, যা দর্শকের শারীরিক পরিবর্তন অনুযায়ী বদলে যায়। কয়েক হাজার বছরের নীরব শিল্পের ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আনাদোল প্রশ্ন তুলেছেন—যদি শিল্পকর্মও আমাদের অনুভূতি বুঝতে পারে এবং প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে কেমন হবে? তখন শিল্প আর নিস্তব্ধ বস্তু থাকে না, হয়ে ওঠে এক জীবন্ত সঙ্গী।

ডেটাল্যান্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় সৃষ্টি হলো ‘মেশিন ড্রিমস; রেইনফরেস্ট’। আমাজন সফরের সময় আনাদোল সেখানকার ইয়াওয়ানাওয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেখানে একটি হামিংবার্ড পাখি নিয়ে তাঁর দেখা স্বপ্নই এই কাজের মূল ভিত্তি। এই পাখির মাধ্যমে প্রকৃতির নিজস্ব স্মৃতিকে তাঁর ‘লার্জ নেচার মডেল’-এর ডেটার সাহায্যে দৃশ্যমান করা হয়েছে। তবে এখানে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্নও উঠে আসে—প্রকৃতিকে যখন ডেটায় রূপান্তর করা হয়, তখন কি আমরা আসলেই তাকে বুঝতে পারি, নাকি কেবল তার একটি অনুবাদ তৈরি করি? একটি অরণ্য কি শুধু তার গাছের সংখ্যা বা একটি নদী কি শুধু তার প্রবাহের পরিসংখ্যান?

জাদুঘরটির ‘ইনফিনিটি রুম’ এই প্রশ্নগুলোকে আরও জীবন্ত করে তোলে। আয়না, আলো, শব্দ, সুগন্ধ এবং এআই-এর তৈরি পরিবর্তনশীল ছবির সমন্বয়ে দর্শকরা এখানে নিজেদের শরীরের সীমানা হারিয়ে ফেলেন। এক মুহূর্তে মনে হতে পারে আপনি কোনো গভীর বনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর পরের মুহূর্তেই সেই বন ভেঙে আলো আর ডেটার এক অচেনা স্বপ্নে পরিণত হয়। এই শিল্পকর্মে ইয়াইয়ি কুসামা, ড্যান ফ্লাভিন এবং জেমস টারেলের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের প্রভাব স্পষ্ট, যারা একসময় আলো ও স্থান নিয়ে কাজ করেছিলেন।

তবে প্রযুক্তিই ডেটাল্যান্ডের একমাত্র বিস্ময় নয়। এফসুন এরকিলিচের মতে, একটি বন নিজেই এক পরম বিস্ময় এবং মানুষের কাজ হলো সেই বিস্ময়কে নতুন করে দেখতে শেখা। এই কারণেই ডেটাল্যান্ড দর্শকদের অনুরোধ করে প্রদর্শনী দেখার সময় তাদের ফোন নামিয়ে রাখতে, যাতে তারা ছবি তোলার চেয়ে শিল্পের ভেতরে কিছুক্ষণ বাঁচতে পারেন। এখানে হাজার বছরের পুরোনো প্রশ্ন “এই শিল্প আমাকে কী অনুভব করায়?” বদলে গিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়— “আমি যখন অনুভব করি, তখন শিল্পটি কেমন হয়ে ওঠে?”