লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানকে ঘিরছে মার্কিন সামরিক শক্তি, মোতায়েন হচ্ছে নতুন রণতরি ও ১০ হাজার সেনা

ইরানের চারপাশ নতুন করে ঘিরে ফেলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন সেনা, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি ইরানে কোনো হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন নাকি কেবল দরকষাকষির টেবিলে দেশটিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে চান, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের পতনশীল রাজনৈতিক ইমেজ পুনরুদ্ধার করতেই ট্রাম্প এই রণপ্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইতিমধ্যে ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন করছে ওয়াশিংটন। আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে গত রোববার ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি বহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এর ঠিক একদিন পর যাত্রা শুরু করেছে মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ), যাতে রয়েছে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন রণতরি বহর ও নৌবাহিনীর অন্যান্য মোতায়েনের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে যাচ্ছে, যার মধ্যে নাবিক ও মেরিন সেনারাও অন্তর্ভুক্ত।

নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন এই সামরিক বহরে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকে অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে তানিয়া আরও জানান, diplomatic আলোচনা যেদিকেই যাক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি ‘টেবিলে রাখা’ই এই মোতায়েনের মূল লক্ষ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো সেনা বা সরঞ্জাম প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেছেন, ট্রাম্প নতুন কোনো হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী সেই যুদ্ধে জড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি। ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে প্রথম মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে একপর্যায়ে ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা অবস্থান করছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। চলতি বছরের শুরু থেকে ট্রাম্প এই উপস্থিতি আরও বাড়াতে শুরু করেন, যার অংশ হিসেবে প্রথমে আরব সাগরে পাঠানো হয়েছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি।

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা ও সামরিক বিমান চলাচল পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মার্কিন বিমানশক্তির সবচেয়ে বড় আকস্মিক বৃদ্ধি। এই তালিকায় রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস) বিমান, এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২ এয়ার সুপিরিওরিটি যুদ্ধবিমান এবং এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে কার্গো বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারসহ এসব বিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।

এর আগে মার্চ মাসে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল, যা তিনটি পৃথক ইউনিটে বিভক্ত ছিল। প্রথম ইউনিটে ছিল আমেরিকা শ্রেণির উভচর হামলাজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের (এমইইউ) নেতৃত্বাধীন ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। দ্বিতীয়টি ছিল দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থানকারী ইউএসএস বক্সার ও ১১তম এমইইউ-এর বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। এই দুটি ইউনিট প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক যুক্ত করেছে। তৃতীয় ইউনিটে ছিল উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে আসা ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার প্যারাশুট হামলাকারী সেনা। সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রোঞ্জের লড়াই: বাংলাদেশকে ১৬৬ রানের টার্গেট দিল শ্রীলঙ্কা

ইরানকে ঘিরছে মার্কিন সামরিক শক্তি, মোতায়েন হচ্ছে নতুন রণতরি ও ১০ হাজার সেনা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:৩৮:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ইরানের চারপাশ নতুন করে ঘিরে ফেলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন সেনা, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি ইরানে কোনো হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন নাকি কেবল দরকষাকষির টেবিলে দেশটিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে চান, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের পতনশীল রাজনৈতিক ইমেজ পুনরুদ্ধার করতেই ট্রাম্প এই রণপ্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইতিমধ্যে ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েন করছে ওয়াশিংটন। আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে গত রোববার ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি বহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এর ঠিক একদিন পর যাত্রা শুরু করেছে মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ), যাতে রয়েছে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন রণতরি বহর ও নৌবাহিনীর অন্যান্য মোতায়েনের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে অতিরিক্ত ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে যাচ্ছে, যার মধ্যে নাবিক ও মেরিন সেনারাও অন্তর্ভুক্ত।

নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি এবং দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন এই সামরিক বহরে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকে অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে তানিয়া আরও জানান, diplomatic আলোচনা যেদিকেই যাক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি ‘টেবিলে রাখা’ই এই মোতায়েনের মূল লক্ষ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো সেনা বা সরঞ্জাম প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেছেন, ট্রাম্প নতুন কোনো হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী সেই যুদ্ধে জড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনার নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি। ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে প্রথম মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে একপর্যায়ে ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা অবস্থান করছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। চলতি বছরের শুরু থেকে ট্রাম্প এই উপস্থিতি আরও বাড়াতে শুরু করেন, যার অংশ হিসেবে প্রথমে আরব সাগরে পাঠানো হয়েছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি।

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা ও সামরিক বিমান চলাচল পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মার্কিন বিমানশক্তির সবচেয়ে বড় আকস্মিক বৃদ্ধি। এই তালিকায় রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবোর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস) বিমান, এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২ এয়ার সুপিরিওরিটি যুদ্ধবিমান এবং এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউরোপের ঘাঁটি থেকে কার্গো বিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারসহ এসব বিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।

এর আগে মার্চ মাসে পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল, যা তিনটি পৃথক ইউনিটে বিভক্ত ছিল। প্রথম ইউনিটে ছিল আমেরিকা শ্রেণির উভচর হামলাজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি এবং ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের (এমইইউ) নেতৃত্বাধীন ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। দ্বিতীয়টি ছিল দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থানকারী ইউএসএস বক্সার ও ১১তম এমইইউ-এর বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ। এই দুটি ইউনিট প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক যুক্ত করেছে। তৃতীয় ইউনিটে ছিল উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে আসা ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার প্যারাশুট হামলাকারী সেনা। সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।