লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিভাইসের গতি ও মাল্টিটাস্কিং সচল রাখতে কেন র‍্যাম অপরিহার্য

কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মাদারবোর্ডে প্রসেসরের ঠিক পাশেই অবস্থান করে ছোটখাটো ও পকেট সাইজের চিরুনির মতো দেখতে একটি যন্ত্রাংশ, যাকে আমরা র‍্যাম (RAM) নামে চিনি। আকারে বেশ ছোট হলেও কাজের ক্ষেত্রে একে প্রসেসরের ‘ডান হাত’ বলা চলে। র‍্যাম ছাড়া কোনো ডিজিটাল ডিভাইস সচল রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ডিভাইসে এই র‍্যামের মূল ভূমিকা বা কাজ আসলে কী, তা একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব।

ধরা যাক আপনি একটি বিশাল লাইব্রেরিতে গেলেন, যেখানে তাকে তাকে সাজানো আছে হাজারো বই। ক্যাটালগ ঘেঁটে প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই বের করার পর সেগুলো পড়ার জন্য আপনার একটি টেবিল প্রয়োজন হবে। প্রতিটি বইয়ের অল্প একটু পড়ে আবার তাকে রেখে এসে অন্য বই আনা নিশ্চয়ই কার্যকর কোনো পদ্ধতি নয়। বরং পড়ার টেবিলটি যত বড় হবে, আপনি তত বেশি বই সামনে ছড়িয়ে রেখে দ্রুত তথ্য খুঁজে নিতে পারবেন। কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক এমন। এখানে লাইব্রেরির বুকশেলফ বা তাক হলো হার্ডড্রাইভ, পড়ার টেবিল হলো র‍্যাম এবং পাঠকের মস্তিষ্ক হলো প্রসেসর।

র‍্যামের পূর্ণরূপ হলো ‘র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি’। এটি মূলত কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের একটি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশালা। কোনো অ্যাপ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে প্রসেসর তার প্রয়োজনীয় ডেটা হার্ডড্রাইভ থেকে এনে সাময়িকভাবে এই র‍্যামে জমা করে। একে ‘র্যান্ডম’ বলার কারণ হলো, প্রসেসর চাইলে যেকোনো মেমোরি সেল থেকে সরাসরি ডেটা পড়তে বা লিখতে পারে। পুরোনো দিনের ক্যাসেট ফিতার মতো এখানে ক্রমান্বয়ে বা সিরিয়ালি ডেটা খুঁজতে হয় না।

র‍্যামের ভেতরের বিজ্ঞানটি বেশ চমকপ্রদ। সবচেয়ে সাধারণ র‍্যামকে বলা হয় ডায়নামিক র‍্যাম বা ডিআরএএম (DRAM)। এর প্রতিটি মেমোরি সেল একটি ট্রানজিস্টর ও একটি ক্যাপাসিটর দিয়ে গঠিত। এই ক্যাপাসিটরকে ইলেকট্রন ধারণকারী একটি ছোট বালতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। বালতিটি পূর্ণ থাকলে তা ‘১’ এবং খালি থাকলে ‘০’ নির্দেশ করে। তবে এই বালতিটি কিছুটা ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই ইলেকট্রন লিক হয়ে যায়। এই কারণে ডেটা ধরে রাখতে মেমোরি কন্ট্রোলারকে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার এই বালতিগুলো রিফ্রেশ করতে হয়। ক্রমাগত রিফ্রেশ করার এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই এর নাম ডায়নামিক র‍্যাম।

ডিভাইসে র‍্যামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রসেসর যতই শক্তিশালী হোক না কেন, র‍্যাম ছাড়া তা অত্যন্ত ধীরগতির হয়ে পড়বে। যেমন—ফেসবুক স্ক্রল করার সময় হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এলে আপনি সেখানে চলে যান। র‍্যামের উপস্থিতির কারণে ফেসবুক অ্যাপটি ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে এবং পুনরায় ফিরে এলে আগের জায়গা থেকেই স্ক্রল করা যায়। একেই বলা হয় মাল্টিটাস্কিং। র‍্যাম না থাকলে ফেসবুক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপটি বন্ধ হয়ে যেত এবং পুনরায় তা মূল স্টোরেজ থেকে লোড করতে অনেক সময় লাগত।

র‍্যামের কার্যকারিতা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—ধারণক্ষমতা ও গতি। র‍্যামের ধারণক্ষমতা যত বেশি হবে, কাজের ‘টেবিল’ তত বড় হবে এবং একসঙ্গে অনেক বেশি প্রোগ্রাম চালানো যাবে। র‍্যামের ঘাটতি দেখা দিলে কম্পিউটার বাধ্য হয়ে হার্ডড্রাইভের কিছু অংশকে ‘ভার্চ্যুয়াল মেমোরি’ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু হার্ডড্রাইভের গতি র‍্যামের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় তখন ডিভাইস ধীরগতির হয়ে যায়।

র‍্যামের গতি মাপা হয় মেগাহার্টজ (MHz) এককে, যা সেকেন্ডে মিলিয়ন সাইকেল নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো র‍্যামে যদি ‘DDR4-3200MHz’ লেখা থাকে, তবে এর অর্থ হলো এটি প্রতি সেকেন্ডে ৩২০ কোটি বার ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম। এটি মূলত ডেটা চলাচলের একটি চওড়া হাইওয়ের মতো কাজ করে। এছাড়া ডিডিআর বা ‘ডাবল ডেটা রেট’ প্রযুক্তির কারণে ঘড়ির কাঁটার ওঠানামা—উভয় সময়েই ডেটা স্থানান্তরিত হয়, যা গতিকে দ্বিগুণ করে দেয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, র‍্যাম হলো এমন এক কর্মী যা ধীরগতির স্টোরেজ ও অত্যন্ত দ্রুতগতির প্রসেসরের মধ্যে সংযোগ সেতু তৈরি করে। এটি ছাড়া আধুনিক স্মার্টফোন বা কম্পিউটার কেবল একটি অলস বাক্সে পরিণত হতো। নেক্সালাইজের সফটওয়্যার ডেভেলপারের লেখা এই তথ্যগুলো ডেল ডটকম, হাউ স্টাফ ওয়ার্কস, বিজনেস ইনসাইডার ও ইটসাইজার সূত্রের বরাতে ২০২৬ সালের আগস্ট সংখ্যা বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপাল ও চীনে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ আড়াই হাজার

ডিভাইসের গতি ও মাল্টিটাস্কিং সচল রাখতে কেন র‍্যাম অপরিহার্য

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৩২:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মাদারবোর্ডে প্রসেসরের ঠিক পাশেই অবস্থান করে ছোটখাটো ও পকেট সাইজের চিরুনির মতো দেখতে একটি যন্ত্রাংশ, যাকে আমরা র‍্যাম (RAM) নামে চিনি। আকারে বেশ ছোট হলেও কাজের ক্ষেত্রে একে প্রসেসরের ‘ডান হাত’ বলা চলে। র‍্যাম ছাড়া কোনো ডিজিটাল ডিভাইস সচল রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ডিভাইসে এই র‍্যামের মূল ভূমিকা বা কাজ আসলে কী, তা একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব।

ধরা যাক আপনি একটি বিশাল লাইব্রেরিতে গেলেন, যেখানে তাকে তাকে সাজানো আছে হাজারো বই। ক্যাটালগ ঘেঁটে প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই বের করার পর সেগুলো পড়ার জন্য আপনার একটি টেবিল প্রয়োজন হবে। প্রতিটি বইয়ের অল্প একটু পড়ে আবার তাকে রেখে এসে অন্য বই আনা নিশ্চয়ই কার্যকর কোনো পদ্ধতি নয়। বরং পড়ার টেবিলটি যত বড় হবে, আপনি তত বেশি বই সামনে ছড়িয়ে রেখে দ্রুত তথ্য খুঁজে নিতে পারবেন। কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক এমন। এখানে লাইব্রেরির বুকশেলফ বা তাক হলো হার্ডড্রাইভ, পড়ার টেবিল হলো র‍্যাম এবং পাঠকের মস্তিষ্ক হলো প্রসেসর।

র‍্যামের পূর্ণরূপ হলো ‘র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি’। এটি মূলত কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের একটি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশালা। কোনো অ্যাপ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে প্রসেসর তার প্রয়োজনীয় ডেটা হার্ডড্রাইভ থেকে এনে সাময়িকভাবে এই র‍্যামে জমা করে। একে ‘র্যান্ডম’ বলার কারণ হলো, প্রসেসর চাইলে যেকোনো মেমোরি সেল থেকে সরাসরি ডেটা পড়তে বা লিখতে পারে। পুরোনো দিনের ক্যাসেট ফিতার মতো এখানে ক্রমান্বয়ে বা সিরিয়ালি ডেটা খুঁজতে হয় না।

র‍্যামের ভেতরের বিজ্ঞানটি বেশ চমকপ্রদ। সবচেয়ে সাধারণ র‍্যামকে বলা হয় ডায়নামিক র‍্যাম বা ডিআরএএম (DRAM)। এর প্রতিটি মেমোরি সেল একটি ট্রানজিস্টর ও একটি ক্যাপাসিটর দিয়ে গঠিত। এই ক্যাপাসিটরকে ইলেকট্রন ধারণকারী একটি ছোট বালতির সঙ্গে তুলনা করা যায়। বালতিটি পূর্ণ থাকলে তা ‘১’ এবং খালি থাকলে ‘০’ নির্দেশ করে। তবে এই বালতিটি কিছুটা ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই ইলেকট্রন লিক হয়ে যায়। এই কারণে ডেটা ধরে রাখতে মেমোরি কন্ট্রোলারকে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার বার এই বালতিগুলো রিফ্রেশ করতে হয়। ক্রমাগত রিফ্রেশ করার এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই এর নাম ডায়নামিক র‍্যাম।

ডিভাইসে র‍্যামের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রসেসর যতই শক্তিশালী হোক না কেন, র‍্যাম ছাড়া তা অত্যন্ত ধীরগতির হয়ে পড়বে। যেমন—ফেসবুক স্ক্রল করার সময় হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এলে আপনি সেখানে চলে যান। র‍্যামের উপস্থিতির কারণে ফেসবুক অ্যাপটি ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে এবং পুনরায় ফিরে এলে আগের জায়গা থেকেই স্ক্রল করা যায়। একেই বলা হয় মাল্টিটাস্কিং। র‍্যাম না থাকলে ফেসবুক থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপটি বন্ধ হয়ে যেত এবং পুনরায় তা মূল স্টোরেজ থেকে লোড করতে অনেক সময় লাগত।

র‍্যামের কার্যকারিতা মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—ধারণক্ষমতা ও গতি। র‍্যামের ধারণক্ষমতা যত বেশি হবে, কাজের ‘টেবিল’ তত বড় হবে এবং একসঙ্গে অনেক বেশি প্রোগ্রাম চালানো যাবে। র‍্যামের ঘাটতি দেখা দিলে কম্পিউটার বাধ্য হয়ে হার্ডড্রাইভের কিছু অংশকে ‘ভার্চ্যুয়াল মেমোরি’ হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু হার্ডড্রাইভের গতি র‍্যামের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় তখন ডিভাইস ধীরগতির হয়ে যায়।

র‍্যামের গতি মাপা হয় মেগাহার্টজ (MHz) এককে, যা সেকেন্ডে মিলিয়ন সাইকেল নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো র‍্যামে যদি ‘DDR4-3200MHz’ লেখা থাকে, তবে এর অর্থ হলো এটি প্রতি সেকেন্ডে ৩২০ কোটি বার ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম। এটি মূলত ডেটা চলাচলের একটি চওড়া হাইওয়ের মতো কাজ করে। এছাড়া ডিডিআর বা ‘ডাবল ডেটা রেট’ প্রযুক্তির কারণে ঘড়ির কাঁটার ওঠানামা—উভয় সময়েই ডেটা স্থানান্তরিত হয়, যা গতিকে দ্বিগুণ করে দেয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, র‍্যাম হলো এমন এক কর্মী যা ধীরগতির স্টোরেজ ও অত্যন্ত দ্রুতগতির প্রসেসরের মধ্যে সংযোগ সেতু তৈরি করে। এটি ছাড়া আধুনিক স্মার্টফোন বা কম্পিউটার কেবল একটি অলস বাক্সে পরিণত হতো। নেক্সালাইজের সফটওয়্যার ডেভেলপারের লেখা এই তথ্যগুলো ডেল ডটকম, হাউ স্টাফ ওয়ার্কস, বিজনেস ইনসাইডার ও ইটসাইজার সূত্রের বরাতে ২০২৬ সালের আগস্ট সংখ্যা বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত হয়েছে।