লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স: মরক্কোকেও থামানো গেল না

কাতার বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত কোনো দলই তাদের হারানোর মতো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই ফ্রান্সকে হারাতে পারে এমন দল হিসেবে ২০০২ সালের ব্রাজিল বা ২০১০ সালের স্পেনকে নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ কেউ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সকেও এই তালিকায় রাখছেন, তবে বর্তমান দলটির অপ্রতিরোধ্য গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘পরম-রূপ’ ধারণ করে যেন সেরাদের সেরা হয়ে উঠেছে এই ফ্রান্স দল।

মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্স শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তারা দুবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু মরক্কোর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিন বুনুর অতিমানবীয় সেভে সে যাত্রায় বেঁচে যায় মরক্কো। এই দুটি আক্রমণই যেন পুরো ম্যাচের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এরপর শুরু হয় ফ্রান্সের আক্রমণের ঝড়। মাইকেল ওলিসে ও আদ্রিয়াঁ রাবিওরা মিডফিল্ডে প্লে-মেক করছিলেন, আর এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে ও দেম্বেলেরা আক্রমণকে পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

ফ্রান্সের আক্রমণের ঢেউ এতটাই তীব্র ছিল যে মরক্কোর ১১ জন খেলোয়াড়কে নিচে নেমে ‘বাস পার্ক’ করতে বাধ্য হতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পেরে নুসাইর মাজরাউয়ি বক্সের ভেতর এমবাপ্পেকে ফাউল করে বসেন। তবে সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম দুর্বল পেনাল্টি শট নিয়ে সুযোগটি হাতছাড়া করেন এমবাপ্পে। পেনাল্টিতে গোল না পেলেও ফ্রান্সের সমর্থকদের স্নায়ুচাপে ভোগার কোনো কারণ ছিল না, কারণ বোঝাই যাচ্ছিল, এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত গোল করলে সেটি হবে ফ্রান্সই। ম্যাচের আগে ‘মরক্কো-ভীতি’ তৈরির চেষ্টা করা হলেও, সেসব ততক্ষণে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও, বিরতির পর ঠিকই ভেঙে পড়ে মরক্কোর রক্ষণ। প্রথমার্ধের খানিকটা ছায়ায় ঢাকা পড়া এমবাপ্পে ম্যাচের ৬০ মিনিটে আলোয় এসে দাঁড়ালেন, বক্সের কাছাকাছি জায়গা থেকে তার ট্রেডমার্ক শটে দুর্দান্ত এক গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন। এর ছয় মিনিট পর, ৬৬ মিনিটে, দেম্বেলের গোল আসে। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো তখন ম্যাচ থেকে অনেক দূরে ছিটকে যায় এবং তাদের ফেরার পথ ছিল না। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।

অথচ ম্যাচ শুরুর আগে মরক্কোকে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ধাপ। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে এমন একপেশে লড়াই হবে, তা কেউ ভাবেনি। ম্যাচে দুই দলের শক্তির পার্থক্য বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: প্রথমার্ধে ফ্রান্স গোলের উদ্দেশে ১৩টি শট নেয়, আর মরক্কো মাত্র ১টি। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল ১২ শট, যা কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচে অবিশ্বাস্য। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এমন পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর প্রথমার্ধে শটের ব্যবধানে এর চেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মাত্র একবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল ১৭টি শট নিয়েছিল, যেখানে সুইডেন নিয়েছিল মাত্র ১টি। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে জিতেছিল এবং কয়েক দিন পর শিরোপাও ঘরে তুলেছিল।

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি ফ্রান্সকে, যা তাদের অপ্রতিরোধ্যতার বড় প্রমাণ। এমবাপ্পে একবার বলেছিলেন, ‘কুৎসিত ফুটবল আমরাও খেলতে জানি’। ফ্রান্স মূলত তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন তারা এগিয়ে থাকে। কারণ, তখন প্রতিপক্ষকে সমতায় ফেরার জন্য আক্রমণে উঠতেই হয়, আর তাতেই ফাঁকা জায়গা পেয়ে ফ্রান্সের দুরন্ত গতির ফরোয়ার্ডরা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। মরক্কোর বিপক্ষেও ঠিক সেটাই হয়েছিল; এমবাপ্পের প্রথম গোলের পর সমতায় ফেরার চেষ্টায় মরক্কো ওপরে উঠে আসে, আর সেই সুযোগে পাল্টা আক্রমণ থেকে উসমান দেম্বেলে গোল করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।

স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আক্রমণভাগ এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ফ্রান্সকে এখন পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দলের চেয়ে বেশি চাপে ফেলতে পারে। নিঃসন্দেহে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রথম একাদশ এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ বেঞ্চ ফ্রান্সের। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবারই দেখিয়েছে, পুরো একটি সফল অভিযান ভেঙে পড়তে কখনো কখনো কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। আপাতত সেই কয়েক মিনিটের ওপর ভরসা করা ছাড়া প্রতিপক্ষ দলগুলোর খুব বেশি কিছু করার নেই। সেমিফাইনালে ও ফাইনালে যদি প্রতিপক্ষ শুরুতে এগিয়ে যায়, তখন ফ্রান্স কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটি দেখার মতোই হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা সফরে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর

বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স: মরক্কোকেও থামানো গেল না

প্রকাশিত হয়েছে: ১২:৩২:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

কাতার বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত কোনো দলই তাদের হারানোর মতো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই ফ্রান্সকে হারাতে পারে এমন দল হিসেবে ২০০২ সালের ব্রাজিল বা ২০১০ সালের স্পেনকে নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ কেউ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সকেও এই তালিকায় রাখছেন, তবে বর্তমান দলটির অপ্রতিরোধ্য গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘পরম-রূপ’ ধারণ করে যেন সেরাদের সেরা হয়ে উঠেছে এই ফ্রান্স দল।

মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে ফ্রান্স শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। ম্যাচের প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তারা দুবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু মরক্কোর গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিন বুনুর অতিমানবীয় সেভে সে যাত্রায় বেঁচে যায় মরক্কো। এই দুটি আক্রমণই যেন পুরো ম্যাচের পূর্বাভাস দিয়েছিল। এরপর শুরু হয় ফ্রান্সের আক্রমণের ঝড়। মাইকেল ওলিসে ও আদ্রিয়াঁ রাবিওরা মিডফিল্ডে প্লে-মেক করছিলেন, আর এমবাপ্পে, দেজিরে দুয়ে ও দেম্বেলেরা আক্রমণকে পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

ফ্রান্সের আক্রমণের ঢেউ এতটাই তীব্র ছিল যে মরক্কোর ১১ জন খেলোয়াড়কে নিচে নেমে ‘বাস পার্ক’ করতে বাধ্য হতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের আক্রমণের চাপ সামলাতে না পেরে নুসাইর মাজরাউয়ি বক্সের ভেতর এমবাপ্পেকে ফাউল করে বসেন। তবে সম্ভবত নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম দুর্বল পেনাল্টি শট নিয়ে সুযোগটি হাতছাড়া করেন এমবাপ্পে। পেনাল্টিতে গোল না পেলেও ফ্রান্সের সমর্থকদের স্নায়ুচাপে ভোগার কোনো কারণ ছিল না, কারণ বোঝাই যাচ্ছিল, এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত গোল করলে সেটি হবে ফ্রান্সই। ম্যাচের আগে ‘মরক্কো-ভীতি’ তৈরির চেষ্টা করা হলেও, সেসব ততক্ষণে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

প্রথমার্ধে ফ্রান্সকে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও, বিরতির পর ঠিকই ভেঙে পড়ে মরক্কোর রক্ষণ। প্রথমার্ধের খানিকটা ছায়ায় ঢাকা পড়া এমবাপ্পে ম্যাচের ৬০ মিনিটে আলোয় এসে দাঁড়ালেন, বক্সের কাছাকাছি জায়গা থেকে তার ট্রেডমার্ক শটে দুর্দান্ত এক গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন। এর ছয় মিনিট পর, ৬৬ মিনিটে, দেম্বেলের গোল আসে। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর মরক্কো তখন ম্যাচ থেকে অনেক দূরে ছিটকে যায় এবং তাদের ফেরার পথ ছিল না। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।

অথচ ম্যাচ শুরুর আগে মরক্কোকে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান ছিল মাত্র পাঁচ ধাপ। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে এমন একপেশে লড়াই হবে, তা কেউ ভাবেনি। ম্যাচে দুই দলের শক্তির পার্থক্য বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: প্রথমার্ধে ফ্রান্স গোলের উদ্দেশে ১৩টি শট নেয়, আর মরক্কো মাত্র ১টি। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল ১২ শট, যা কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচে অবিশ্বাস্য। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এমন পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর প্রথমার্ধে শটের ব্যবধানে এর চেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মাত্র একবার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিল ১৭টি শট নিয়েছিল, যেখানে সুইডেন নিয়েছিল মাত্র ১টি। সেই ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ গোলে জিতেছিল এবং কয়েক দিন পর শিরোপাও ঘরে তুলেছিল।

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একবারও পিছিয়ে পড়তে হয়নি ফ্রান্সকে, যা তাদের অপ্রতিরোধ্যতার বড় প্রমাণ। এমবাপ্পে একবার বলেছিলেন, ‘কুৎসিত ফুটবল আমরাও খেলতে জানি’। ফ্রান্স মূলত তখনই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন তারা এগিয়ে থাকে। কারণ, তখন প্রতিপক্ষকে সমতায় ফেরার জন্য আক্রমণে উঠতেই হয়, আর তাতেই ফাঁকা জায়গা পেয়ে ফ্রান্সের দুরন্ত গতির ফরোয়ার্ডরা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। মরক্কোর বিপক্ষেও ঠিক সেটাই হয়েছিল; এমবাপ্পের প্রথম গোলের পর সমতায় ফেরার চেষ্টায় মরক্কো ওপরে উঠে আসে, আর সেই সুযোগে পাল্টা আক্রমণ থেকে উসমান দেম্বেলে গোল করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন।

স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা আর্জেন্টিনার মতো দলগুলোর আক্রমণভাগ এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ফ্রান্সকে এখন পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়া যেকোনো দলের চেয়ে বেশি চাপে ফেলতে পারে। নিঃসন্দেহে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রথম একাদশ এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ বেঞ্চ ফ্রান্সের। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবারই দেখিয়েছে, পুরো একটি সফল অভিযান ভেঙে পড়তে কখনো কখনো কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। আপাতত সেই কয়েক মিনিটের ওপর ভরসা করা ছাড়া প্রতিপক্ষ দলগুলোর খুব বেশি কিছু করার নেই। সেমিফাইনালে ও ফাইনালে যদি প্রতিপক্ষ শুরুতে এগিয়ে যায়, তখন ফ্রান্স কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, সেটি দেখার মতোই হবে।