লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১১:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পে স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের সতর্কতা, ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর আভাস

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার আশা করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

এরই মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেছিল দাতা সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অংকের অর্থের সংস্থান করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি, যার ওপর যোগ হয়েছে বাজেট ঘাটতির বড় চাপ। এই পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এছাড়া বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ তৈরি হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হলে তাদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এই খাতে মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, 'জনপ্রশাসন-নিট' খাতে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা মেটাতে ব্যয় করা হবে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি ব্যয় যে হারে বাড়ছে, রাজস্ব আদায় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে একবারে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজেট ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে এবং দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা অনেক বেড়ে যাবে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারি সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক ধাপে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে সরকার ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি করার একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নতুন পে স্কেল দেওয়া জরুরি হলেও, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার কৌশলই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

মিরপুর-১১ নম্বরে পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া

পে স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের সতর্কতা, ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর আভাস

প্রকাশিত হয়েছে: ০১:৩৭:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার আশা করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

এরই মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেছিল দাতা সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বিবেচনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল অংকের অর্থের সংস্থান করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি, যার ওপর যোগ হয়েছে বাজেট ঘাটতির বড় চাপ। এই পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এছাড়া বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ তৈরি হলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। নতুন পে স্কেল কার্যকর করা হলে তাদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এই খাতে মোট ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, 'জনপ্রশাসন-নিট' খাতে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা মেটাতে ব্যয় করা হবে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি ব্যয় যে হারে বাড়ছে, রাজস্ব আদায় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে একবারে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজেট ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে এবং দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা অনেক বেড়ে যাবে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারি সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক ধাপে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে সরকার ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি করার একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নতুন পে স্কেল দেওয়া জরুরি হলেও, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার কৌশলই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।