লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৬:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার তারিখ যেভাবে ঠিক হয়েছিল

১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ, যখন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত বিভাজন ও স্বাধীনতার রূপরেখা ঘোষণা করেন। তবে সেই ঘোষণার আগে পর্যন্ত স্বাধীনতার তারিখটি ছিল অনিশ্চিত। ডমিনিক ল্যাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্সের 'ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট' বই অনুযায়ী, ৩রা জুন প্ল্যান ঘোষণার আগের রাতে ভাইসরয় ভবনে এক গভীর নীরবতা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল।

২রা জুন রাতে সাতজন ভারতীয় নেতা মাউন্টব্যাটেনের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন জওহরলাল নেহেরু, সর্দার প্যাটেল ও আচার্য কৃপালানি। মুসলিম লীগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান ও আবদুররাব নিশতার। শিখদের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন বলদেব সিং। এটিই ছিল প্রথম বড় বৈঠক যেখানে মহাত্মা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন না। মাউন্টব্যাটেন ওই বৈঠকে তার পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন, যার মধ্যে ছিল পাঞ্জাব ও বাংলার কাউন্সিলরদের আলাদা বৈঠক, দুটি ডোমিনিয়ন ও গণপরিষদ গঠন, সিন্ধু প্রদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও সিলেটের গণভোট এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের বাধ্যবাধকতা। মাউন্টব্যাটেন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে হায়দ্রাবাদ পাকিস্তানে যোগ দেবে না এবং সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করা হবে। তিনি আশা করেছিলেন মধ্যরাতের মধ্যেই সবাই এই পরিকল্পনা মেনে নেবেন।

মধ্যরাতের দ্বিতীয় বৈঠকে মহাত্মা গান্ধী যোগ দিলেও তিনি নীরবতা পালন করেন। মাউন্টব্যাটেন তাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেলেও গান্ধী ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীরবতার ইঙ্গিত দেন। তিনি পাঁচটি খামে লিখে জানান, সোমবার তার নীরবতার ব্রত পালনের দিন। তিনি লিখেছিলেন যে জরুরি সমস্যা বা অসুস্থ কারো সেবার প্রয়োজন ছাড়া তিনি নীরবতা ভাঙেন না, তবে মাউন্টব্যাটেন যেন আজ তার নীরবতা ভাঙার আশা না করেন। জিন্নাহ ওই পরিকল্পনা মেনে নিতে ইতস্তত বোধ করলে মাউন্টব্যাটেন তাকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। মাউন্টব্যাটেন বলেন, তিনি জিন্নাহকে পরিকল্পনা নষ্ট করতে দেবেন না এবং পরদিন বৈঠকে তিনি ঘোষণা করবেন যে জিন্নাহর সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে এবং জিন্নাহ এতে সম্মত হয়েছেন। মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহকে অনুরোধ করেন যেন তিনি কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানান, অন্যথায় পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।

পরদিন ৩রা জুন সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। নেহেরু হিন্দিতে বলেন, 'বেদনা ও যন্ত্রণার মধ্যে, ভারতের মহান ভবিষ্যত তৈরি হচ্ছে।' এরপর জিন্নাহ ইংরেজিতে ভাষণ দেন এবং 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে শেষ করেন। স্বাধীনতার তারিখটি লর্ড মাউন্টব্যাটেন অনেকটা আকস্মিকভাবেই ঘোষণা করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ সম্পর্কে ভাবছিলেন, তখন জাপানের কাছে আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকীর স্মৃতি তাকে তাড়িত করে। সেই তাড়না থেকেই তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখটি ঘোষণা করেন। এই আকস্মিক ঘোষণায় লন্ডন থেকে ভারত পর্যন্ত তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৪ই ও ১৫ই আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে ভারত বিভাজিত হয় এবং পাকিস্তান নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরের দিন গান্ধী এক প্রার্থনা সভায় বলেছিলেন, বিভাজনের জন্য ভাইসরয়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই, বরং নিজের দিকে তাকাতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

যান্ত্রিক ত্রুটিতে ফের বন্ধ বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিট

ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার তারিখ যেভাবে ঠিক হয়েছিল

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৫৩:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ, যখন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত বিভাজন ও স্বাধীনতার রূপরেখা ঘোষণা করেন। তবে সেই ঘোষণার আগে পর্যন্ত স্বাধীনতার তারিখটি ছিল অনিশ্চিত। ডমিনিক ল্যাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্সের 'ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট' বই অনুযায়ী, ৩রা জুন প্ল্যান ঘোষণার আগের রাতে ভাইসরয় ভবনে এক গভীর নীরবতা ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল।

২রা জুন রাতে সাতজন ভারতীয় নেতা মাউন্টব্যাটেনের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন জওহরলাল নেহেরু, সর্দার প্যাটেল ও আচার্য কৃপালানি। মুসলিম লীগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান ও আবদুররাব নিশতার। শিখদের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন বলদেব সিং। এটিই ছিল প্রথম বড় বৈঠক যেখানে মহাত্মা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন না। মাউন্টব্যাটেন ওই বৈঠকে তার পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন, যার মধ্যে ছিল পাঞ্জাব ও বাংলার কাউন্সিলরদের আলাদা বৈঠক, দুটি ডোমিনিয়ন ও গণপরিষদ গঠন, সিন্ধু প্রদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও সিলেটের গণভোট এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর ভারত বা পাকিস্তানে যোগদানের বাধ্যবাধকতা। মাউন্টব্যাটেন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে হায়দ্রাবাদ পাকিস্তানে যোগ দেবে না এবং সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠন করা হবে। তিনি আশা করেছিলেন মধ্যরাতের মধ্যেই সবাই এই পরিকল্পনা মেনে নেবেন।

মধ্যরাতের দ্বিতীয় বৈঠকে মহাত্মা গান্ধী যোগ দিলেও তিনি নীরবতা পালন করেন। মাউন্টব্যাটেন তাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেলেও গান্ধী ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীরবতার ইঙ্গিত দেন। তিনি পাঁচটি খামে লিখে জানান, সোমবার তার নীরবতার ব্রত পালনের দিন। তিনি লিখেছিলেন যে জরুরি সমস্যা বা অসুস্থ কারো সেবার প্রয়োজন ছাড়া তিনি নীরবতা ভাঙেন না, তবে মাউন্টব্যাটেন যেন আজ তার নীরবতা ভাঙার আশা না করেন। জিন্নাহ ওই পরিকল্পনা মেনে নিতে ইতস্তত বোধ করলে মাউন্টব্যাটেন তাকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। মাউন্টব্যাটেন বলেন, তিনি জিন্নাহকে পরিকল্পনা নষ্ট করতে দেবেন না এবং পরদিন বৈঠকে তিনি ঘোষণা করবেন যে জিন্নাহর সাথে তার বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে এবং জিন্নাহ এতে সম্মত হয়েছেন। মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহকে অনুরোধ করেন যেন তিনি কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানান, অন্যথায় পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।

পরদিন ৩রা জুন সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। নেহেরু হিন্দিতে বলেন, 'বেদনা ও যন্ত্রণার মধ্যে, ভারতের মহান ভবিষ্যত তৈরি হচ্ছে।' এরপর জিন্নাহ ইংরেজিতে ভাষণ দেন এবং 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে শেষ করেন। স্বাধীনতার তারিখটি লর্ড মাউন্টব্যাটেন অনেকটা আকস্মিকভাবেই ঘোষণা করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখ সম্পর্কে ভাবছিলেন, তখন জাপানের কাছে আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকীর স্মৃতি তাকে তাড়িত করে। সেই তাড়না থেকেই তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট তারিখটি ঘোষণা করেন। এই আকস্মিক ঘোষণায় লন্ডন থেকে ভারত পর্যন্ত তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৪ই ও ১৫ই আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে ভারত বিভাজিত হয় এবং পাকিস্তান নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরের দিন গান্ধী এক প্রার্থনা সভায় বলেছিলেন, বিভাজনের জন্য ভাইসরয়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই, বরং নিজের দিকে তাকাতে হবে।