লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবারও কেডিএস গ্রুপের কবলে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক

আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব আবারও পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন করে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ মূলত চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের হাতে চলে এসেছে। তবে নতুন পর্ষদে অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিচালক নিয়োগের দুই দিনের মধ্যেই দুজনকে পর্ষদ থেকে বাদ দিতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেডিএস গ্রুপ আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বেও ছিল। ওই সময় দুই ব্যাংকের সঙ্গেই বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আগে চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেও এসব বিতর্কিত কর্মকর্তার কয়েকজনকে দেখা গেছে। একই সময়ে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরে এসেছি। এখন আমার মূল দায়িত্ব ব্যাংকটিকে পেশাদারির সঙ্গে পরিচালনা করা, যাতে নতুন করে কোনো অনিয়ম না হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাদের চাকরি গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। নতুন করে অনিয়ম হলে ব্যাংকটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমার প্রধান কাজ।” তিনি আরও দাবি করেন যে, ডিএমডি নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন এবং পর্ষদ সভার দিন পরিবেশ ভালো না থাকায় অনেকে দেখা করতে এসেছিলেন, কিন্তু কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর দুটি পক্ষ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানা ফেরত চায় এবং আরেকটি পক্ষ তাদের শেয়ারের বিপরীতে পরিচালক পদ দাবি করে। সরকারের একটি পর্যায় থেকে দুই পক্ষের যাদের হাতে ২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা ছিল, তাদের হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগের পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালককেও বহাল রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পর্ষদে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের মধ্যে ছয়জনই কেডিএস গ্রুপ ও গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তারা হলেন—কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তার ছেলে সেলিম রহমান, খলিলুর রহমানের ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। এ ছাড়া কেডিএস মালিকদের আত্মীয়রাও পর্ষদে নিয়োগ পেয়েছেন। নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানও কেডিএস পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। অন্য পরিচালকদের মধ্যে আছেন মো. এনায়াত উল্লাহ, রফিকুল ইসলাম, ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, আবদুস সালাম ও লিয়াকত আলী চৌধুরী। এ বিষয়ে মো. এনায়াত উল্লাহ বলেন, “আমি বহুদিন পর ব্যাংকের পরিচালক পদ ফিরে পেয়েছি। নতুন করে আর কাউকে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

কেডিএস গ্রুপ থেকে পাঁচজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একই পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ নেই। কেডিএসের ওই দুই প্রতিনিধি বাদ যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে চলছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে। তাই আমরাও চেয়েছিলাম ব্যাংকগুলো ভালো ও প্রকৃত শেয়ারধারীদের হাতে ফিরুক। তবে শুরুটা ভালো হলো না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে বাধ্য হয়ে একটি গ্রুপের হাতে আল-আরাফাহ্‌ ব্যাংকটি তুলে দিতে হয়েছে।”

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা ব্যাংকে ফিরে আসতে নানাভাবে চাপ তৈরি করেছেন। এ ছাড়া গত দুই বছরে ব্যাংকে নতুন করে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন নতুন চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এবং কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান। তাদের নির্দেশে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন চাকরি ছেড়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নতুন পর্ষদে কেডিএস গ্রুপের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে পুরোনো সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের (এস আলম) ভাই আবদুস সামাদ লাবু এর আগে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন। এদিকে, কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান বর্তমানে ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন। তার ব্যবহারের জন্য অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি কেনার তথ্য আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছিল। অন্য সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুস সামাদ লাবু। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এস আলম গ্রুপ যখন ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে অপসারণ করে। ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি জেলও খেটেছেন। এখন তাকেই আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক আমানতকারী তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে অতীতে ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের আবারও দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেওয়া উচিত, যাদের অতীত কর্মকাণ্ডে ব্যাংকের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। পরিচালকদের নিয়োগের আগে তাদের অতীত ইতিহাস ও ব্যাংকিং খাতে ভূমিকা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আবারও কোনো পক্ষের প্রভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগজনক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্য পরিচালকদের মধ্যে আছেন ঢাকা-৭ আসনে সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াতের হয়ে নির্বাচন করা মো.

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রমিকদের জন্য জরুরি মহার্ঘ ভাতা চালুর দাবি সাইফুল হকের

আবারও কেডিএস গ্রুপের কবলে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক

প্রকাশিত হয়েছে: ১১:৩০:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব আবারও পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন করে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ মূলত চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের হাতে চলে এসেছে। তবে নতুন পর্ষদে অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিচালক নিয়োগের দুই দিনের মধ্যেই দুজনকে পর্ষদ থেকে বাদ দিতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেডিএস গ্রুপ আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বেও ছিল। ওই সময় দুই ব্যাংকের সঙ্গেই বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আগে চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেও এসব বিতর্কিত কর্মকর্তার কয়েকজনকে দেখা গেছে। একই সময়ে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন পর ব্যাংকে ফিরে এসেছি। এখন আমার মূল দায়িত্ব ব্যাংকটিকে পেশাদারির সঙ্গে পরিচালনা করা, যাতে নতুন করে কোনো অনিয়ম না হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাদের চাকরি গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। নতুন করে অনিয়ম হলে ব্যাংকটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমার প্রধান কাজ।” তিনি আরও দাবি করেন যে, ডিএমডি নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন এবং পর্ষদ সভার দিন পরিবেশ ভালো না থাকায় অনেকে দেখা করতে এসেছিলেন, কিন্তু কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর দুটি পক্ষ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানা ফেরত চায় এবং আরেকটি পক্ষ তাদের শেয়ারের বিপরীতে পরিচালক পদ দাবি করে। সরকারের একটি পর্যায় থেকে দুই পক্ষের যাদের হাতে ২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা ছিল, তাদের হাতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগের পাঁচ স্বতন্ত্র পরিচালককেও বহাল রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পর্ষদে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের মধ্যে ছয়জনই কেডিএস গ্রুপ ও গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। তারা হলেন—কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তার ছেলে সেলিম রহমান, খলিলুর রহমানের ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। এ ছাড়া কেডিএস মালিকদের আত্মীয়রাও পর্ষদে নিয়োগ পেয়েছেন। নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানও কেডিএস পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। অন্য পরিচালকদের মধ্যে আছেন মো. এনায়াত উল্লাহ, রফিকুল ইসলাম, ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, আবদুস সালাম ও লিয়াকত আলী চৌধুরী। এ বিষয়ে মো. এনায়াত উল্লাহ বলেন, “আমি বহুদিন পর ব্যাংকের পরিচালক পদ ফিরে পেয়েছি। নতুন করে আর কাউকে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”

কেডিএস গ্রুপ থেকে পাঁচজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কারণ, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একই পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ নেই। কেডিএসের ওই দুই প্রতিনিধি বাদ যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে চলছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই চলছে। তাই আমরাও চেয়েছিলাম ব্যাংকগুলো ভালো ও প্রকৃত শেয়ারধারীদের হাতে ফিরুক। তবে শুরুটা ভালো হলো না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে বাধ্য হয়ে একটি গ্রুপের হাতে আল-আরাফাহ্‌ ব্যাংকটি তুলে দিতে হয়েছে।”

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা ব্যাংকে ফিরে আসতে নানাভাবে চাপ তৈরি করেছেন। এ ছাড়া গত দুই বছরে ব্যাংকে নতুন করে যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন নতুন চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এবং কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান। তাদের নির্দেশে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন চাকরি ছেড়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নতুন পর্ষদে কেডিএস গ্রুপের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে পুরোনো সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের (এস আলম) ভাই আবদুস সামাদ লাবু এর আগে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন। এদিকে, কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সেলিম রহমান বর্তমানে ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন। তার ব্যবহারের জন্য অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি কেনার তথ্য আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছিল। অন্য সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুস সামাদ লাবু। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এস আলম গ্রুপ যখন ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে অপসারণ করে। ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি জেলও খেটেছেন। এখন তাকেই আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক আমানতকারী তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে অতীতে ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের আবারও দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেওয়া উচিত, যাদের অতীত কর্মকাণ্ডে ব্যাংকের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই। পরিচালকদের নিয়োগের আগে তাদের অতীত ইতিহাস ও ব্যাংকিং খাতে ভূমিকা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি আবারও কোনো পক্ষের প্রভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগজনক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্য পরিচালকদের মধ্যে আছেন ঢাকা-৭ আসনে সর্বশেষ নির্বাচনে জামায়াতের হয়ে নির্বাচন করা মো.