লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ, পেছনে পড়ল ইউক্রেন

ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের হারের কারণে বিশ্বে এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে এই তালিকার শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। তবে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, আদায় বৃদ্ধি এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি এই হার দ্রুত কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আড়ালে থাকা অনিয়মিত ও বেনামি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করায় প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে এবং দেশটিকে তালিকার শীর্ষে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা পরবর্তী তিন মাসেই ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যার পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪,৫১৫ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা; মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে নিয়মিত দেখিয়ে আড়াল করা হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক, যেখানে বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানিসংকটও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস ডেটাবেজ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ, যেখানে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ প্রাপ্ত খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। তালিকায় ৩০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার আরেক দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, যেখানে ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে চতুর্থ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ হার নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের তালিকায় শীর্ষে থাকা ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার ২০২৩ সালে ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা রাশিয়ার হামলার পর প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। তবে ২০২৪ সাল থেকে দেশটির ঋণ পরিস্থিতি উন্নত হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৩৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন হৃভনিয়া (১ ডলার সমান ৪৪.৬১ হৃভনিয়া) বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ২৭ শতাংশে। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করায় ১ ডিসেম্বর যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, তা ১ জানুয়ারি ২০২৬-এ কমে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই এই হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির ১৭ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। অবলোপন করা হলেও প্রিভাতব্যাংক এসব অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেন ছাড়াও লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলে আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে এবং দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা করছে। তবে একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের নানা ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ, অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ না করলে ব্যাংক খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না। আবারও নির্বিচার পুনঃ তফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে খেলাপি ঋণের হার সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রমিকদের জন্য জরুরি মহার্ঘ ভাতা চালুর দাবি সাইফুল হকের

খেলাপি ঋণের হারে বিশ্বে শীর্ষে বাংলাদেশ, পেছনে পড়ল ইউক্রেন

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:১৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের হারের কারণে বিশ্বে এখন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে এই তালিকার শীর্ষে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। তবে পুরোনো খেলাপি ঋণ অবলোপন, আদায় বৃদ্ধি এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি এই হার দ্রুত কমিয়ে এনেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আড়ালে থাকা অনিয়মিত ও বেনামি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করায় প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে এবং দেশটিকে তালিকার শীর্ষে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা পরবর্তী তিন মাসেই ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যার পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪,৫১৫ কোটি টাকা। অথচ ২০২৪ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা; মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে নিয়মিত দেখিয়ে আড়াল করা হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পর্যালোচনা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষায় অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক, যেখানে বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংকের অর্ধেকের বেশি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া ভুয়া ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায় মন্দা এবং জ্বালানিসংকটও খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস ডেটাবেজ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ, যেখানে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ প্রাপ্ত খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। তালিকায় ৩০ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকার আরেক দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, যেখানে ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ২০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে চতুর্থ এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ হার নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের তালিকায় শীর্ষে থাকা ইউক্রেনের খেলাপি ঋণের হার ২০২৩ সালে ছিল ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা রাশিয়ার হামলার পর প্রায় ৩৯ শতাংশে উঠেছিল। তবে ২০২৪ সাল থেকে দেশটির ঋণ পরিস্থিতি উন্নত হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৩৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন হৃভনিয়া (১ ডলার সমান ৪৪.৬১ হৃভনিয়া) বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং খেলাপি ঋণের হার নেমে আসে ২৭ শতাংশে। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রিভাতব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক বিপুল পরিমাণ পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন করায় ১ ডিসেম্বর যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, তা ১ জানুয়ারি ২০২৬-এ কমে ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই এই হার আরও কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির ১৭ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। অবলোপন করা হলেও প্রিভাতব্যাংক এসব অর্থ উদ্ধারে ইউক্রেন ছাড়াও লন্ডন, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলে আইনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ শ্রেণীকরণ ও সঞ্চিতি রাখার নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে এবং দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা করছে। তবে একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের নানা ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ, অর্থ আদায়, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ না করলে ব্যাংক খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না। আবারও নির্বিচার পুনঃ তফসিল ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে খেলাপি ঋণের হার সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটবে না।