লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৭:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের ৭০ মৃত্যুফাঁদ: ৫ বছরে ঝরল ২৪০০ প্রাণ

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যাত্রা এখন এক অদৃশ্য শঙ্কার নাম। ভোরের কুয়াশা হোক কিংবা দুপুরের ব্যস্ত সময়, এই ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের প্রতিটি বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগে গতি এলেও, সেই গতির সাথে তাল মেলাতে পারেনি এই সরু মহাসড়কটির অবকাঠামো। মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত এই দুই লেনের সড়কে রয়েছে অন্তত ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, যা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ঘটেছে কুয়াকাটা মহাসড়কের এসব বিপজ্জনক বাঁকে। স্থানীয়দের কাছে সানুহার, বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী ও ইচলাদীসহ উজিরপুরের অন্তত আটটি বাঁক অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হিসেবে পরিচিত। এছাড়া গৌরনদীর ভুরঘাটা, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, পিঙ্গলাকাঠি, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ এলাকা, বরিশাল সদরের কাশীপুর, গড়িয়ারপাড়, দপদপিয়া, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষীপাশা, বোয়ালিয়া, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া, কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়াসহ বহু স্থান এখন দুর্ঘটনার ‘ব্ল্যাক স্পট’ হয়ে উঠেছে।

সানুহার বাজারের ব্যবসায়ী মো. ছগির জানান, দুই যুগ ধরে তিনি এই মহাসড়কের পাশে ব্যবসা করছেন এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন। অভিজ্ঞ চালক কালাচাঁদ দাসের মতে, পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে এসে হঠাৎ সরু মহাসড়কের তীক্ষ্ণ বাঁকগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন বাস কোম্পানিগুলোর মধ্যে সময়ের প্রতিযোগিতা থাকে। বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, বরিশাল অঞ্চলের মাত্র ৫৬ কিলোমিটার অংশে ৪০টির বেশি বাঁক রয়েছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বা মুখোমুখি সংঘর্ষে বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৫৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪২১ জন নিহত হয়েছেন। নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দাবি করেন, বরিশাল বিভাগের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় সাড়ে ৩ ভাগই ঘটে এই মহাসড়কে। তিনি চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বন্ধ করাসহ বাস মালিকদের সাথে আলোচনা করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যানবাহন চলাচল দ্বিগুণ বাড়লেও সড়কটি এখনো দুই লেনের। তিনি দাবি করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণ ও চিহ্ন দেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে এবং ৬ লেনের সড়ক নির্মাণ হলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে। অন্যদিকে, বিআরটিএ-এর পরিচালক জিয়াউর রহমান জানান, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বকশীগঞ্জে মাদক সেবনের দায়ে যুবককে ৬ মাসের কারাদণ্ড

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের ৭০ মৃত্যুফাঁদ: ৫ বছরে ঝরল ২৪০০ প্রাণ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:০১:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে যাত্রা এখন এক অদৃশ্য শঙ্কার নাম। ভোরের কুয়াশা হোক কিংবা দুপুরের ব্যস্ত সময়, এই ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের প্রতিটি বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগে গতি এলেও, সেই গতির সাথে তাল মেলাতে পারেনি এই সরু মহাসড়কটির অবকাঠামো। মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত এই দুই লেনের সড়কে রয়েছে অন্তত ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, যা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য প্রাণ।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ঘটেছে কুয়াকাটা মহাসড়কের এসব বিপজ্জনক বাঁকে। স্থানীয়দের কাছে সানুহার, বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী ও ইচলাদীসহ উজিরপুরের অন্তত আটটি বাঁক অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হিসেবে পরিচিত। এছাড়া গৌরনদীর ভুরঘাটা, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, পিঙ্গলাকাঠি, বাবুগঞ্জের নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ এলাকা, বরিশাল সদরের কাশীপুর, গড়িয়ারপাড়, দপদপিয়া, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, বাকেরগঞ্জের লক্ষীপাশা, বোয়ালিয়া, চরামদ্দি, আমতলীর শাখারিয়া, কলাপাড়ার মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়াসহ বহু স্থান এখন দুর্ঘটনার ‘ব্ল্যাক স্পট’ হয়ে উঠেছে।

সানুহার বাজারের ব্যবসায়ী মো. ছগির জানান, দুই যুগ ধরে তিনি এই মহাসড়কের পাশে ব্যবসা করছেন এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন। অভিজ্ঞ চালক কালাচাঁদ দাসের মতে, পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে এসে হঠাৎ সরু মহাসড়কের তীক্ষ্ণ বাঁকগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন বাস কোম্পানিগুলোর মধ্যে সময়ের প্রতিযোগিতা থাকে। বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, বরিশাল অঞ্চলের মাত্র ৫৬ কিলোমিটার অংশে ৪০টির বেশি বাঁক রয়েছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বা মুখোমুখি সংঘর্ষে বড় দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৫৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৪২১ জন নিহত হয়েছেন। নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দাবি করেন, বরিশাল বিভাগের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় সাড়ে ৩ ভাগই ঘটে এই মহাসড়কে। তিনি চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বন্ধ করাসহ বাস মালিকদের সাথে আলোচনা করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যানবাহন চলাচল দ্বিগুণ বাড়লেও সড়কটি এখনো দুই লেনের। তিনি দাবি করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণ ও চিহ্ন দেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে এবং ৬ লেনের সড়ক নির্মাণ হলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে। অন্যদিকে, বিআরটিএ-এর পরিচালক জিয়াউর রহমান জানান, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।