লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট

শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা বেআইনি বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে গভর্নিং বডির সভাপতির কেবল টেলিফোনিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করাও সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদন খারিজ করে গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত রোববার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। মামলায় রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামরুজ্জামান এবং শিক্ষকের পক্ষে জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর, যখন গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছোট মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে। এর জেরে ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় নোটিস দেওয়া হয় এবং ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন। এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা টেলিফোন নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।

পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে প্রস্তাব পাঠানো হলে, ২০ এপ্রিলের সভায় তা নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গভর্নিং বডির সভাপতি আখতারুজ্জামান হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রুল ও স্থগিতাদেশ উভয়ই খারিজ করে দেয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, বেসরকারি কলেজের শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে লিখিত নোটিস দিয়ে ব্যাখ্যার জন্য কমপক্ষে সাত দিন সময় দিতে হবে। নোটিসে প্রস্তাবিত শাস্তির কথা থাকতে হবে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুনানি চান কি না, তাও জানতে হবে। ব্যক্তিগত শুনানি চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে আদালত বলেছে, যথাযথভাবে ডাকা গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করতে হবে। সভাপতি বা অন্য কারও মৌখিক কিংবা টেলিফোনিক নির্দেশ আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের বিকল্প হতে পারে না। টেলিফোনে কমিটি গঠনকে আইনি প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার নথিতে অভিযোগের ঘটনার তারিখ নিয়েও বড় ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে আদালত। মূল অভিযোগে ৯ নভেম্বর উল্লেখ থাকলেও প্রথম নোটিসে ৭ নভেম্বর এবং তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত কমিটির সামনে শিক্ষককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি এবং কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে সাত দিনের বদলে ছয় দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ায় এতে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালত মন্তব্য করেছে।

রায়ে বলা হয়, গভর্নিং বডি শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করতে পারে না, তারা কেবল প্রস্তাব দিতে পারে। বরখাস্ত কার্যকরের আগেই আপিল ও সালিশ কমিটির মাধ্যমে বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এ মামলায় ১ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত কার্যকর করে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। আদালত জানায়, গভর্নিং বডি বোর্ডের বাধ্যতামূলক অনুমোদনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা 'রাবার স্ট্যাম্প' হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহাল এবং বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ যথাযথ ও আইনসম্মত বলে রায়ে বলা হয়েছে। তবে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শিক্ষক আবুল মনসুর অবসরের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবসরের বয়সে পৌঁছানোর তারিখ পর্যন্ত তাঁর বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

৩৭.৪১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট

প্রকাশিত হয়েছে: ০৭:০১:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির পূর্বানুমোদন ছাড়া কেবল গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা বেআইনি বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে গভর্নিং বডির সভাপতির কেবল টেলিফোনিক নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করাও সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদন খারিজ করে গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। গত রোববার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। মামলায় রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামরুজ্জামান এবং শিক্ষকের পক্ষে জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও সুলতান মাহমুদ বান্না।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর, যখন গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছোট মেয়ের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ ওঠে সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে। এর জেরে ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় নোটিস দেওয়া হয় এবং ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন। এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা টেলিফোন নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।

পরবর্তীতে অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে প্রস্তাব পাঠানো হলে, ২০ এপ্রিলের সভায় তা নামঞ্জুর করে ওই শিক্ষককে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। বোর্ডের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে গভর্নিং বডির সভাপতি আখতারুজ্জামান হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রুল ও স্থগিতাদেশ উভয়ই খারিজ করে দেয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, বেসরকারি কলেজের শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে লিখিত নোটিস দিয়ে ব্যাখ্যার জন্য কমপক্ষে সাত দিন সময় দিতে হবে। নোটিসে প্রস্তাবিত শাস্তির কথা থাকতে হবে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুনানি চান কি না, তাও জানতে হবে। ব্যক্তিগত শুনানি চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে আদালত বলেছে, যথাযথভাবে ডাকা গভর্নিং বডির সভায় আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করতে হবে। সভাপতি বা অন্য কারও মৌখিক কিংবা টেলিফোনিক নির্দেশ আনুষ্ঠানিক রেজুলেশনের বিকল্প হতে পারে না। টেলিফোনে কমিটি গঠনকে আইনি প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার নথিতে অভিযোগের ঘটনার তারিখ নিয়েও বড় ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে আদালত। মূল অভিযোগে ৯ নভেম্বর উল্লেখ থাকলেও প্রথম নোটিসে ৭ নভেম্বর এবং তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত কমিটির সামনে শিক্ষককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি এবং কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে সাত দিনের বদলে ছয় দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কমিয়ে দেওয়ায় এতে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আদালত মন্তব্য করেছে।

রায়ে বলা হয়, গভর্নিং বডি শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত করতে পারে না, তারা কেবল প্রস্তাব দিতে পারে। বরখাস্ত কার্যকরের আগেই আপিল ও সালিশ কমিটির মাধ্যমে বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এ মামলায় ১ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত কার্যকর করে ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। আদালত জানায়, গভর্নিং বডি বোর্ডের বাধ্যতামূলক অনুমোদনকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা 'রাবার স্ট্যাম্প' হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। গচিহাটা কলেজের গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহাল এবং বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ যথাযথ ও আইনসম্মত বলে রায়ে বলা হয়েছে। তবে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শিক্ষক আবুল মনসুর অবসরের বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁকে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবসরের বয়সে পৌঁছানোর তারিখ পর্যন্ত তাঁর বকেয়া বেতন, চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।