লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীদের আদি ইতিহাস ও বসতি স্থাপনের নেপথ্য কাহিনি

বর্তমান বিশ্বে মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইল। কেবল মুসলিম সম্প্রদায় নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এই চরম মানবতাবিরোধী ও সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনে ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন ও লেবাননে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি দূরবর্তী পারসিক সভ্যতার দেশ ইরান পর্যন্ত তাদের অব্যাহত হামলার শিকার হচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের নিশানা করে হত্যা করছে, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। গাজায় শত শত বুলেটে ঝাঁজরা হওয়া ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু হিন্দ রাজাবের নির্মম হত্যাকাণ্ড আজ বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত শিশুদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের জন্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে ইহুদিদের ওপর চালানো বর্বরতার ‘ভিকটিমহুড’কে পুঁজি করে এই ‘নিও-কলোনিয়াল সেটলার’ বা নব্য-ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ফিলিস্তিনের জনগণকে অমানবিক উপায়ে নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে কৃত্রিম এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পেছনে তৎকালীন জাতিসংঘসহ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল নামের এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে জায়নিস্ট সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিন ও আইজাক শামিরের হাত ধরে। ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল মেনাহেম বেগিনের ‘ইরগুন’ এবং আইজাক শামিরের ‘লেহি’ দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনের ‘দেইর ইয়াসিন’ গ্রামে গভীর রাতে হামলা চালিয়ে নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে। সেই থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর শুরু হওয়া গণহত্যার ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

চরম পরিহাসের বিষয় হলো, কুখ্যাত সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিন এবং আইজাক শামির—উভয়ই পরবর্তীকালে তথাকথিত গণতান্ত্রিক ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আরও বড় বিস্ময় হলো, কট্টর ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিনকে ১৯৭৮ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল নিশ্চয়ই এমন কোনো গণহত্যাকারীকে পুরস্কৃত করার জন্য নিজের সম্পদ দান করে যাননি। শান্তিতে এই ধরনের নোবেল পুরস্কার প্রদান বিশ্বশান্তির সঙ্গে এক নির্মম তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস হয়তো এই মন্তব্যে কিছুটা আহত হতে পারেন, তবে ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে। এই নরপিশাচ মেনাহেম বেগিন বা তার বাবা-মা কেউই মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দা ছিলেন না; তারা ছিলেন বেলারুশের নাগরিক। ১৯৪২ সালে পোল্যান্ডের হিটলারবিরোধী সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে বেগিন প্রথম ফিলিস্তিনের মাটিতে পা রাখেন এবং পরে সেখানে বসতি স্থাপন করে ‘ইরগুন’ নামের সন্ত্রাসী দল গড়ে তোলেন। এই সাবেক সন্ত্রাসী ১৯৭৭ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯২ সালে আইজাক রাবিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগপর্যন্ত ইসরাইলের পূর্ববর্তী সব প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন ইউরোপ থেকে আগত বসতি স্থাপনকারী। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণার নেতৃত্বদানকারী ডেভিড বেন গুরিয়ানও বংশ ও জন্মসূত্রে পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। তার আসল নাম ছিল ডেভিড গ্রুন, যা পরে তিনি হিব্রু ভাষায় পরিবর্তন করে বেন গুরিয়ান রাখেন। ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রথম ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের বাবা-মাও যথাক্রমে ইউক্রেন ও বেলারুশ থেকে এসে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

ইসরাইলের ইতিহাসে মোট ১৪ জন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ৭ জন সরাসরি বাইরে থেকে আসা বসতি স্থাপনকারী এবং বাকি ৭ জন ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেও তাদের প্রত্যেকের বাবা-মা ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে আসা অভিবাসী ছিলেন। এদের কারও ধমনিতে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ত ছিল না। অথচ তাদের দাবি হলো, ঈশ্বর নাকি তিন হাজার বছর আগে ফিলিস্তিনের জমি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কট্টরপন্থী জায়নিস্টরা মনে করে, ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন করা ঈশ্বরের নির্দেশ এবং এটি অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ফিলিস্তিনের মুসলমানদের মানুষ বলেই গণ্য করে না।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্ম নেওয়া বাকি ৬ জন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক ইতিহাসও একই সূত্রে গাঁথা। লেবাননের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানো জেনারেল এরিল শ্যারনের প্রকৃত নাম ছিল এরিক শিনারম্যান। তার বাবা-মা বেলারুশ থেকে ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনে আসেন। শ্যারন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী এহুদ বারাকের প্রকৃত নাম ছিল এহুদ ব্রগ, যার বাবা-মা লিথুয়ানিয়া থেকে এসেছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা এহুদ ওলমার্টের বাবা-মা মোরদেচাই ওলমার্ট এবং বেলা ওয়াগম্যান যথাক্রমে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে এসেছিলেন। ২০২১ ও ২০২২ সালের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বাবা-মা ১৯৬৭ সালে সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরাইলে এসে বসতি স্থাপন করেন।

গাজায় চলমান গণহত্যার মূল নায়ক ও ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাবা পোল্যান্ড থেকে ফিলিস্তিনে এসেছিলেন। তার মায়ের পরিবার লিথুয়ানিয়া থেকে প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে ১৯১১ সালে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে। নেতানিয়াহুর বাবার আসল নাম ছিল বেঞ্জিয়ন মিলেকস্কি, যা পরে হিব্রু করে নেতানিয়াহু রাখা হয়। পোলিশ বংশোদ্ভূত মিলেকস্কির সন্তান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিভিন্ন মেয়াদে ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ানের ১৩ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছেন।

বিশ্বের বুকে এই ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় অপরাধী ভূমিকা পালন করেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিন দখল করে এবং ইউরোপ থেকে ইহুদিদের সেখানে এসে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনের ফলে বিশ্বজুড়ে যে মানবিক সমবেদনা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের অনুমোদনের পর কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র যুদ্ধ করলেও আধুনিক অস্ত্রের অভাব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় তারা পরাজিত হয়। উম্মাহর অনৈক্যের সুযোগে ইসরাইল তার আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তবে এতে আগ্রাসী নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ দেশটির ইহুদি ভোটাররা এতটাই কট্টরপন্থী হয়ে উঠেছেন যে তারা নেতানিয়াহু বা তার চেয়েও চরমপন্থী কোনো ইসলামবিদ্বেষী নেতাকেই বেছে নেবেন।

১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে ইয়াসির আরাফাত পশ্চিমা চাপে অসলো চুক্তির মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নিয়ে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও ইসরাইল ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। অসলো চুক্তির জন্য ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত, শিমন পেরেস ও আইজাক রাবিনকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলেও ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অসলো চুক্তি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, ইসরাইল কখনোই ফিলিস্তিনের ওপর থেকে দখলদারিত্ব ছাড়বে না। গাজা ও পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের অংশ করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৮টি শিশুসহ ৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

তবে দীর্ঘ ৭৮ বছর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। গত সপ্তাহে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা ইসরাইলের ওপর সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর আগে গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসও একই পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে কেবল জার্মানি ও ইতালি এখনও ইসরাইলকে অন্ধ সমর্থন দিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের ইসরাইল নীতির পরিবর্তন ছাড়া এই রাষ্ট্রটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। দুর্ভাগ্যবশত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, মরক্কো ও তিউনিসিয়ার মতো কিছু মুসলিম দেশ নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে ইসরাইলকে তোষণ করছে। সম্প্রতি আলজেরিয়া আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। ওআইসিভুক্ত দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। গাজা ও লেবাননে গণহত্যার বিরুদ্ধে মার্কিন তরুণরাও এখন সোচ্চার হচ্ছে। আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কট্টর ইসরাইল সমর্থক রিপাবলিকানরা পরাজিত হলে ওয়াশিংটনের নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। চরম হতাশার মাঝেও ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তির দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়।

শিরোনামে আমি ইসরাইলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলেছি। সে প্রসঙ্গে দেশটির জন্মের ইতিহাস খানিকটা বর্ণনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হিটলারের বর্বর নাৎসি বাহিনীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ‘ভিকটিমহুড’কে (Victimhood) ব্যবহার করে এই ‘নিও-কলোনিয়াল সেটলার’ (Neo-colonial settler) রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তৎকালীন

জনপ্রিয় সংবাদ

ফেনী হাসপাতালে এমপিদের নিয়ে অশোভন মন্তব্য, ৪ নার্সকে শোকজ

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীদের আদি ইতিহাস ও বসতি স্থাপনের নেপথ্য কাহিনি

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৫০:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বর্তমান বিশ্বে মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইল। কেবল মুসলিম সম্প্রদায় নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এই চরম মানবতাবিরোধী ও সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনে ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিন ও লেবাননে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি দূরবর্তী পারসিক সভ্যতার দেশ ইরান পর্যন্ত তাদের অব্যাহত হামলার শিকার হচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের নিশানা করে হত্যা করছে, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। গাজায় শত শত বুলেটে ঝাঁজরা হওয়া ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু হিন্দ রাজাবের নির্মম হত্যাকাণ্ড আজ বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত শিশুদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের জন্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে ইহুদিদের ওপর চালানো বর্বরতার ‘ভিকটিমহুড’কে পুঁজি করে এই ‘নিও-কলোনিয়াল সেটলার’ বা নব্য-ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। ফিলিস্তিনের জনগণকে অমানবিক উপায়ে নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে কৃত্রিম এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পেছনে তৎকালীন জাতিসংঘসহ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল নামের এই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে জায়নিস্ট সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিন ও আইজাক শামিরের হাত ধরে। ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল মেনাহেম বেগিনের ‘ইরগুন’ এবং আইজাক শামিরের ‘লেহি’ দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনের ‘দেইর ইয়াসিন’ গ্রামে গভীর রাতে হামলা চালিয়ে নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে। সেই থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর শুরু হওয়া গণহত্যার ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

চরম পরিহাসের বিষয় হলো, কুখ্যাত সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিন এবং আইজাক শামির—উভয়ই পরবর্তীকালে তথাকথিত গণতান্ত্রিক ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আরও বড় বিস্ময় হলো, কট্টর ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিনকে ১৯৭৮ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল নিশ্চয়ই এমন কোনো গণহত্যাকারীকে পুরস্কৃত করার জন্য নিজের সম্পদ দান করে যাননি। শান্তিতে এই ধরনের নোবেল পুরস্কার প্রদান বিশ্বশান্তির সঙ্গে এক নির্মম তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস হয়তো এই মন্তব্যে কিছুটা আহত হতে পারেন, তবে ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে। এই নরপিশাচ মেনাহেম বেগিন বা তার বাবা-মা কেউই মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দা ছিলেন না; তারা ছিলেন বেলারুশের নাগরিক। ১৯৪২ সালে পোল্যান্ডের হিটলারবিরোধী সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে বেগিন প্রথম ফিলিস্তিনের মাটিতে পা রাখেন এবং পরে সেখানে বসতি স্থাপন করে ‘ইরগুন’ নামের সন্ত্রাসী দল গড়ে তোলেন। এই সাবেক সন্ত্রাসী ১৯৭৭ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯২ সালে আইজাক রাবিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগপর্যন্ত ইসরাইলের পূর্ববর্তী সব প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন ইউরোপ থেকে আগত বসতি স্থাপনকারী। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণার নেতৃত্বদানকারী ডেভিড বেন গুরিয়ানও বংশ ও জন্মসূত্রে পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। তার আসল নাম ছিল ডেভিড গ্রুন, যা পরে তিনি হিব্রু ভাষায় পরিবর্তন করে বেন গুরিয়ান রাখেন। ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রথম ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের বাবা-মাও যথাক্রমে ইউক্রেন ও বেলারুশ থেকে এসে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

ইসরাইলের ইতিহাসে মোট ১৪ জন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ৭ জন সরাসরি বাইরে থেকে আসা বসতি স্থাপনকারী এবং বাকি ৭ জন ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেও তাদের প্রত্যেকের বাবা-মা ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে আসা অভিবাসী ছিলেন। এদের কারও ধমনিতে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ত ছিল না। অথচ তাদের দাবি হলো, ঈশ্বর নাকি তিন হাজার বছর আগে ফিলিস্তিনের জমি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কট্টরপন্থী জায়নিস্টরা মনে করে, ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন করা ঈশ্বরের নির্দেশ এবং এটি অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ফিলিস্তিনের মুসলমানদের মানুষ বলেই গণ্য করে না।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্ম নেওয়া বাকি ৬ জন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক ইতিহাসও একই সূত্রে গাঁথা। লেবাননের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানো জেনারেল এরিল শ্যারনের প্রকৃত নাম ছিল এরিক শিনারম্যান। তার বাবা-মা বেলারুশ থেকে ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনে আসেন। শ্যারন ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী এহুদ বারাকের প্রকৃত নাম ছিল এহুদ ব্রগ, যার বাবা-মা লিথুয়ানিয়া থেকে এসেছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা এহুদ ওলমার্টের বাবা-মা মোরদেচাই ওলমার্ট এবং বেলা ওয়াগম্যান যথাক্রমে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে এসেছিলেন। ২০২১ ও ২০২২ সালের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বাবা-মা ১৯৬৭ সালে সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরাইলে এসে বসতি স্থাপন করেন।

গাজায় চলমান গণহত্যার মূল নায়ক ও ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাবা পোল্যান্ড থেকে ফিলিস্তিনে এসেছিলেন। তার মায়ের পরিবার লিথুয়ানিয়া থেকে প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে ১৯১১ সালে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে। নেতানিয়াহুর বাবার আসল নাম ছিল বেঞ্জিয়ন মিলেকস্কি, যা পরে হিব্রু করে নেতানিয়াহু রাখা হয়। পোলিশ বংশোদ্ভূত মিলেকস্কির সন্তান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিভিন্ন মেয়াদে ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ানের ১৩ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছেন।

বিশ্বের বুকে এই ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় অপরাধী ভূমিকা পালন করেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিন দখল করে এবং ইউরোপ থেকে ইহুদিদের সেখানে এসে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনের ফলে বিশ্বজুড়ে যে মানবিক সমবেদনা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের অনুমোদনের পর কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র যুদ্ধ করলেও আধুনিক অস্ত্রের অভাব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় তারা পরাজিত হয়। উম্মাহর অনৈক্যের সুযোগে ইসরাইল তার আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তবে এতে আগ্রাসী নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ দেশটির ইহুদি ভোটাররা এতটাই কট্টরপন্থী হয়ে উঠেছেন যে তারা নেতানিয়াহু বা তার চেয়েও চরমপন্থী কোনো ইসলামবিদ্বেষী নেতাকেই বেছে নেবেন।

১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে ইয়াসির আরাফাত পশ্চিমা চাপে অসলো চুক্তির মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নিয়ে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও ইসরাইল ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। অসলো চুক্তির জন্য ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত, শিমন পেরেস ও আইজাক রাবিনকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলেও ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অসলো চুক্তি সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, ইসরাইল কখনোই ফিলিস্তিনের ওপর থেকে দখলদারিত্ব ছাড়বে না। গাজা ও পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের অংশ করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৮টি শিশুসহ ৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

তবে দীর্ঘ ৭৮ বছর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। গত সপ্তাহে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা ইসরাইলের ওপর সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর আগে গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসও একই পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে কেবল জার্মানি ও ইতালি এখনও ইসরাইলকে অন্ধ সমর্থন দিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের ইসরাইল নীতির পরিবর্তন ছাড়া এই রাষ্ট্রটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। দুর্ভাগ্যবশত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, মরক্কো ও তিউনিসিয়ার মতো কিছু মুসলিম দেশ নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে ইসরাইলকে তোষণ করছে। সম্প্রতি আলজেরিয়া আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। ওআইসিভুক্ত দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। গাজা ও লেবাননে গণহত্যার বিরুদ্ধে মার্কিন তরুণরাও এখন সোচ্চার হচ্ছে। আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কট্টর ইসরাইল সমর্থক রিপাবলিকানরা পরাজিত হলে ওয়াশিংটনের নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। চরম হতাশার মাঝেও ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তির দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়।

শিরোনামে আমি ইসরাইলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলেছি। সে প্রসঙ্গে দেশটির জন্মের ইতিহাস খানিকটা বর্ণনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হিটলারের বর্বর নাৎসি বাহিনীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ‘ভিকটিমহুড’কে (Victimhood) ব্যবহার করে এই ‘নিও-কলোনিয়াল সেটলার’ (Neo-colonial settler) রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তৎকালীন