লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১০:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরবর্তী হাইকমিশনারের অনুমোদন মেলেনি, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন জটিলতা

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা বিষয়ে টানাপড়েন চলছে। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে মনোনীত পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি। ঢাকায় প্রস্তাব পাঠানোর পর এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নীরবতা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

বাংলাদেশ সরকার তাদের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পেশাদার কূটনীতিক আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পাঠাতে চায়। তবে নিয়ম অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি বা ‘অ্যাগ্রিমো’ নিতে হবে। সিয়াম দীর্ঘদিন ধরে কূটনীতিক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর গত বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেন। ভারতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া নয়াদিল্লিতে তার এই নতুন নিয়োগ কার্যকর করা সম্ভব নয়।

এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বর্তমান হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহর মেয়াদ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের কথা রয়েছে তার। ফলে নয়াদিল্লিতে তার শূন্য পদে দ্রুত নতুন হাইকমিশনারের যোগদান প্রয়োজন।

কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ তার মনোনীত রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে অন্য দেশে সরাসরি পাঠাতে পারে না; স্বাগতিক দেশের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। তবে কোনো দেশ যদি প্রস্তাবিত প্রার্থীকে অনুমোদন না দেয়, তবে তার কারণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়। অনেক দেশই এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে নীরব থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে, যাতে কোনো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বিরোধ প্রকাশ্যে না আসে। তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির এই নীরবতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মোড় পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা ম্লান হয়ে গেছে। গত আগস্টে তারেক রহমানের নির্ধারিত নয়াদিল্লি সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাতে অংশ নেননি। বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি দল কিংবা দিল্লিতে নিযুক্ত বর্তমান হাইকমিশনার হামিদুল্লাহও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন উত্তেজনা।

অবশ্য রাজনৈতিক পর্যায়ে টানাপড়েন থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের সহযোগিতা পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। গত সপ্তাহেই ঢাকায় দুই দিনব্যাপী এক বৈঠকে দুই দেশের কর্মকর্তারা সীমান্তপার রেল যোগাযোগ ও ট্রেন চলাচল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গত সাত মাসে দুই দেশের বেশ কয়েকটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপও সক্রিয় হয়ে কাজ শুরু করেছে, যা দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সচল রাখার ইঙ্গিত দেয়। এর আগে চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয় নয়াদিল্লি, যার পদমর্যাদা মন্ত্রিসভার সমমর্যাদার করা হয়েছে। একে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারতের গুরুত্ব দেওয়ার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ায় নয়াদিল্লির মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। পরে তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোনো রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও উত্তেজনা এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মনোনীত শীর্ষ কূটনৈতিক প্রতিনিধির নিয়োগে ভারতের অনুমোদন ঝুলে থাকার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপান সফরে গেলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

পরবর্তী হাইকমিশনারের অনুমোদন মেলেনি, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন জটিলতা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা বিষয়ে টানাপড়েন চলছে। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে মনোনীত পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি। ঢাকায় প্রস্তাব পাঠানোর পর এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভারতের পক্ষ থেকে এখনও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই নীরবতা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

বাংলাদেশ সরকার তাদের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পেশাদার কূটনীতিক আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পাঠাতে চায়। তবে নিয়ম অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি বা ‘অ্যাগ্রিমো’ নিতে হবে। সিয়াম দীর্ঘদিন ধরে কূটনীতিক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর গত বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেন। ভারতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া নয়াদিল্লিতে তার এই নতুন নিয়োগ কার্যকর করা সম্ভব নয়।

এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সময়কালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বর্তমান হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহর মেয়াদ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের কথা রয়েছে তার। ফলে নয়াদিল্লিতে তার শূন্য পদে দ্রুত নতুন হাইকমিশনারের যোগদান প্রয়োজন।

কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ তার মনোনীত রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে অন্য দেশে সরাসরি পাঠাতে পারে না; স্বাগতিক দেশের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। তবে কোনো দেশ যদি প্রস্তাবিত প্রার্থীকে অনুমোদন না দেয়, তবে তার কারণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়। অনেক দেশই এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে নীরব থেকে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে, যাতে কোনো ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বিরোধ প্রকাশ্যে না আসে। তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লির এই নীরবতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মোড় পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা ম্লান হয়ে গেছে। গত আগস্টে তারেক রহমানের নির্ধারিত নয়াদিল্লি সফর শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাতে অংশ নেননি। বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি দল কিংবা দিল্লিতে নিযুক্ত বর্তমান হাইকমিশনার হামিদুল্লাহও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন উত্তেজনা।

অবশ্য রাজনৈতিক পর্যায়ে টানাপড়েন থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের সহযোগিতা পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। গত সপ্তাহেই ঢাকায় দুই দিনব্যাপী এক বৈঠকে দুই দেশের কর্মকর্তারা সীমান্তপার রেল যোগাযোগ ও ট্রেন চলাচল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গত সাত মাসে দুই দেশের বেশ কয়েকটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপও সক্রিয় হয়ে কাজ শুরু করেছে, যা দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সচল রাখার ইঙ্গিত দেয়। এর আগে চলতি বছরের জুনের শেষ দিকে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয় নয়াদিল্লি, যার পদমর্যাদা মন্ত্রিসভার সমমর্যাদার করা হয়েছে। একে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারতের গুরুত্ব দেওয়ার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ায় নয়াদিল্লির মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। পরে তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরোনো রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও উত্তেজনা এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মনোনীত শীর্ষ কূটনৈতিক প্রতিনিধির নিয়োগে ভারতের অনুমোদন ঝুলে থাকার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।