লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে যেভাবে আঘাত হানছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

জর্ডানে অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গত মার্চের শুরুতে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রথম কোনো হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের প্রাণহানি ঘটল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলা লড়াইয়ের পরও মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেল। পেন্টাগন এ হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি ওয়াশিংটনের সামরিক সীমাবদ্ধতা ও এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এসব সেনা যেসব স্থায়ী ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন, সেগুলো মূলত ইরানের দিন দিন শক্তিশালী হতে থাকা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বহরের একদম নাগালের মধ্যে এবং বেশ অরক্ষিত। লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, মার্কিন সেনাদের বড় অংশই আধা স্থায়ী ব্যারাকে অবস্থান করছেন, যা মূলত রকেট বা দেশীয় প্রযুক্তির বোমার (আইইডি) আঘাত ঠেকানোর উপযোগী। ভারী ও সুনির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা এগুলোর নেই। ফলে এসব ব্যারাকে ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট আঘাত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে।

ক্রিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত না হানলেও এর প্রচণ্ড বিস্ফোরণের চাপে (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনারা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে পড়ছেন। আবার ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হলেও সেটির ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও সেনারা আহত হচ্ছেন। চলমান এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত মার্কিন সেনা নিহত হন। বাকিদের মধ্যে ছয় বৈমানিক মার্চে জ্বালানি নেওয়ার সময় এক বিমান দুর্ঘটনায় এবং এক সেনা সার্জেন্ট ইরাকে ভূপাতিত করা একটি সশস্ত্র ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে প্রাণ হারান। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রায় ২২০টি অবকাঠামো ও সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ইরান মূলত তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের ওপর নির্ভর করছে। মার্কিন বাহিনীর ‘প্যাট্রিয়ট’ এবং ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান ভিন্ন ভিন্ন গতি ও ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যখন তারা নকল লক্ষ্যবস্তু এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্র ব্যবহার করে, তখন মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ধেয়ে আসা অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে সামান্য কয়েকটি অস্ত্র ভেতরে ঢুকে পড়লেই তা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার ক্ষেত্রে ইরান অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাঁর মতে, নিখুঁত নিশানা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়া অথবা বিপুল সংখ্যায় হামলার কারণে দু-একটি ‘ভাগ্যের জোরে লেগে যাওয়া আঘাত’ এর পেছনে কারণ হতে পারে।

ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ আল-জাজিরাকে বলেন, পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক বাহিনী কোনোভাবেই যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেনি। তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও সময়ের সঙ্গে নতুন শিক্ষা নিচ্ছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের এ হামলাগুলো আরও বেশি নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে।

এদিকে টানা ১২ দিন ধরে একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, অতি সম্প্রতি তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র ও হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময় বাহরাইনের সামরিক বাহিনীও ইরান থেকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন মাঝপথে আটকে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক অপারেশন সেন্টার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমানের হ্যাঙ্গার, ড্রোন মজুত রাখার কেন্দ্র ও সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলাগুলো পরিচালনা করেছে। এই অবরোধ কার্যকরে যুক্তরাষ্ট্র ২০টি যুদ্ধজাহাজ ও কয়েক শ উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে।

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন সিনেটে তীব্র জবাবদিহির মুখে পড়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের সামরিক বাহিনী ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে। সিনেটর জন অসফ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, সংঘাতের ১৪তম দিনে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেওয়া সেই বক্তব্য সঠিক ছিল কি না। জবাবে হেগসেথ নিজের অবস্থানে অনড় থেকে দাবি করেন, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’ এবং ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরান যে একদমই হামলা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, তা তাঁরা কখনো আশা করেননি।

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল অবশ্য হেগসেথের যুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, মার্কিন হামলা সত্ত্বেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা শুধু টিকিয়েই রাখেনি, বরং তারা এমন কিছু অত্যাধুনিক ও বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যা আগে কখনো করেনি। ক্যাম্পবেলের মতে, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়টি বাড়িয়ে বলেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ব্যুরিও এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও নিকট ভবিষ্যতে ইরান মার্কিন সেনা ও স্থাপনার ওপর এমন প্রাণঘাতী আঘাত অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।

প্যাট্রিক ব্যুরি আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে আসল সমস্যা হলো ব্যয়ের চরম অসংগতি। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং উৎক্ষেপণের খরচ, সেগুলো মাঝ আকাশে ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের খরচের চেয়ে অনেক গুণ কম। এ বিশাল খরচের পার্থক্যের কারণেই ইরান কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘায়েল করতে পারছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতেও বিষয়টি ঠিক তা-ই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার কোনো প্রয়োজন ইরানের নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির উপস্থিতির ওপর মানবিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে মাঝেমধ্যে কয়েকটি নিখুঁত আঘাত হানতে পারাটাই ইরানের জন্য যথেষ্ট।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা সফরে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর

মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে যেভাবে আঘাত হানছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪:২৭:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

জর্ডানে অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গত মার্চের শুরুতে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এই প্রথম কোনো হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সেনাদের প্রাণহানি ঘটল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলা লড়াইয়ের পরও মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া গেল। পেন্টাগন এ হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি ওয়াশিংটনের সামরিক সীমাবদ্ধতা ও এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এসব সেনা যেসব স্থায়ী ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন, সেগুলো মূলত ইরানের দিন দিন শক্তিশালী হতে থাকা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বহরের একদম নাগালের মধ্যে এবং বেশ অরক্ষিত। লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, মার্কিন সেনাদের বড় অংশই আধা স্থায়ী ব্যারাকে অবস্থান করছেন, যা মূলত রকেট বা দেশীয় প্রযুক্তির বোমার (আইইডি) আঘাত ঠেকানোর উপযোগী। ভারী ও সুনির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা এগুলোর নেই। ফলে এসব ব্যারাকে ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট আঘাত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে।

ক্রিগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত না হানলেও এর প্রচণ্ড বিস্ফোরণের চাপে (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনারা গুরুতর মস্তিষ্কের আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে পড়ছেন। আবার ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হলেও সেটির ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতেও সেনারা আহত হচ্ছেন। চলমান এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সাত মার্কিন সেনা নিহত হন। বাকিদের মধ্যে ছয় বৈমানিক মার্চে জ্বালানি নেওয়ার সময় এক বিমান দুর্ঘটনায় এবং এক সেনা সার্জেন্ট ইরাকে ভূপাতিত করা একটি সশস্ত্র ড্রোনের নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে প্রাণ হারান। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রায় ২২০টি অবকাঠামো ও সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ইরান মূলত তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহরের ওপর নির্ভর করছে। মার্কিন বাহিনীর ‘প্যাট্রিয়ট’ এবং ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান ভিন্ন ভিন্ন গতি ও ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যখন তারা নকল লক্ষ্যবস্তু এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উৎক্ষেপণকেন্দ্র ব্যবহার করে, তখন মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ধেয়ে আসা অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা সম্ভব হলেও প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে সামান্য কয়েকটি অস্ত্র ভেতরে ঢুকে পড়লেই তা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটাতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, যুদ্ধের শুরুর সপ্তাহগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার ক্ষেত্রে ইরান অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাঁর মতে, নিখুঁত নিশানা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়া অথবা বিপুল সংখ্যায় হামলার কারণে দু-একটি ‘ভাগ্যের জোরে লেগে যাওয়া আঘাত’ এর পেছনে কারণ হতে পারে।

ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ নামের একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ আল-জাজিরাকে বলেন, পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক বাহিনী কোনোভাবেই যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেনি। তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও সময়ের সঙ্গে নতুন শিক্ষা নিচ্ছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের এ হামলাগুলো আরও বেশি নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠছে।

এদিকে টানা ১২ দিন ধরে একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, অতি সম্প্রতি তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র ও হেলিকপ্টার রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময় বাহরাইনের সামরিক বাহিনীও ইরান থেকে ধেয়ে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন মাঝপথে আটকে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক অপারেশন সেন্টার, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমানের হ্যাঙ্গার, ড্রোন মজুত রাখার কেন্দ্র ও সামরিক লজিস্টিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলাগুলো পরিচালনা করেছে। এই অবরোধ কার্যকরে যুক্তরাষ্ট্র ২০টি যুদ্ধজাহাজ ও কয়েক শ উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে।

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন সিনেটে তীব্র জবাবদিহির মুখে পড়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের সামরিক বাহিনী ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে। সিনেটর জন অসফ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, সংঘাতের ১৪তম দিনে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেওয়া সেই বক্তব্য সঠিক ছিল কি না। জবাবে হেগসেথ নিজের অবস্থানে অনড় থেকে দাবি করেন, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’ এবং ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও প্রতিরক্ষাশিল্পের ভিত্তি পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরান যে একদমই হামলা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে, তা তাঁরা কখনো আশা করেননি।

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল অবশ্য হেগসেথের যুক্তির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, মার্কিন হামলা সত্ত্বেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা শুধু টিকিয়েই রাখেনি, বরং তারা এমন কিছু অত্যাধুনিক ও বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যা আগে কখনো করেনি। ক্যাম্পবেলের মতে, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের বিষয়টি বাড়িয়ে বলেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক ও ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ব্যুরিও এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও নিকট ভবিষ্যতে ইরান মার্কিন সেনা ও স্থাপনার ওপর এমন প্রাণঘাতী আঘাত অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।

প্যাট্রিক ব্যুরি আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে আসল সমস্যা হলো ব্যয়ের চরম অসংগতি। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং উৎক্ষেপণের খরচ, সেগুলো মাঝ আকাশে ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আধুনিক সরঞ্জামের খরচের চেয়ে অনেক গুণ কম। এ বিশাল খরচের পার্থক্যের কারণেই ইরান কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘায়েল করতে পারছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতেও বিষয়টি ঠিক তা-ই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করার কোনো প্রয়োজন ইরানের নেই। মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির উপস্থিতির ওপর মানবিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করে মাঝেমধ্যে কয়েকটি নিখুঁত আঘাত হানতে পারাটাই ইরানের জন্য যথেষ্ট।