লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৫:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা বাড়ছে, তবে কাটছে না সৌদি ও জর্ডাননির্ভরতা

বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বাইরে যাওয়া নারী কর্মীদের ৯০ শতাংশের বেশি কর্মীর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব ও জর্ডান। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে ৪৮টি দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে নতুন কোনো খাত বা বিকল্প গন্তব্য তৈরি না হওয়ায় এই অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো মধ্যপ্রাচ্যকৈন্দ্রিক রয়ে গেছে।

বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় চেয়ে ৬২ হাজার ৩১৭ জনে, যা তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ কম। তবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৫ হাজার ২১৪ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক সংখ্যার আড়ালে রয়েছে নারী কর্মীদের ফিরে আসার দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। বিদেশফেরত অনেক নারী কর্মীই সেখানে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, একাধিক বাড়িতে কাজ করানো এবং নিয়মিত বেতন ও খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।

নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসা এমনই একজন মানিকগঞ্জের অঞ্জনা। গত ২০ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা এই নারী সেখানে ছিলেন মাত্র ১ মাস ৩ দিন। এর মধ্যে মাত্র ৫ দিন কাজ করতে পেরেছেন তিনি। বাকি সময়টা তাকে কাটাতে হয়েছে সে দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে। শেষ পর্যন্ত নিজের টাকা দিয়ে টিকিট কেটে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। ২০১২ সাল থেকে লেবানন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করা অঞ্জনা জানান, এর আগে কখনো এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার হয়নি। তার অভিযোগ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সৌদিতে নারী কর্মী পাঠালেই টাকা পায়, তাই তারা কাজ নিশ্চিত না করেই নারীদের পাঠিয়ে দেয়।

একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে নরসিংদীর সানজীদা আখতারের। এক বছর আগে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা সানজীদা সেখানে ছিলেন ২ মাস ২৫ দিন। নিয়োগকর্তা তাকে নিজের বাড়ির পাশাপাশি তার মা ও শ্বশুরবাড়িতেও কাজ করাতেন। সানজীদা জানান, তাকে শুধু রুটি খেতে দেওয়া হতো। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসে ফেরত দেওয়া হয় এবং সেখানে শুরু হয় নতুন করে নির্যাতন। অবশেষে নিজের টাকায় টিকিট কেটে দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি।

বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম জানান, নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসা নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো বিচার পান না। এই বাস্তবতায় অন্য নারীরাও এখন সচেতন হচ্ছেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রতি তাদের অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ওকাপের কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, আগে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে নারীরা বিদেশে গেলেও এখন আর তারা যেতে চাইছেন না, বরং তাদের পরিবর্তে পুরুষেরা যাচ্ছেন। ওকাপের গত বছরের একটি গবেষণা বলছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির এবং ৮২ শতাংশ ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মঘণ্টার শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, নারীদের এক কাজের কথা বলে নিয়ে একাধিক কাজ করানো হচ্ছে এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নারীদের বিদেশে না যাওয়াই ভালো বলে মনে করেন তিনি। নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা পরের দুই বছর বাড়লেও ২০২৩ (2023) সালে তা আবার কমে আসে। ফিরে আসা কর্মীদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, রামরু, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ), নারী শ্রমিক কেন্দ্রের মতো সংগঠন। ব্র্যাকের মতে, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছে এবং প্রয়োজনে কর্মী পাঠানো বন্ধও করে দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

এসব সমস্যার বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নারীদের ভীতি দূর করতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং সৌদি আরবে সেফ হোম চালু থাকায় নির্যাতন কমেছে। এর পাশাপাশি সরকার এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ কর্মীর বাজারে নজর দিচ্ছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিংয়ের মতো কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আর কখনো বিদেশে যেতে চান না তিনি।২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এক লাখের বেশি হারে নারী কর্মী বিদেশে গেছেন প্রতিবছর।

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই সংখ্যা কমে আসে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ আইজিপির

নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা বাড়ছে, তবে কাটছে না সৌদি ও জর্ডাননির্ভরতা

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:৪৩:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বাইরে যাওয়া নারী কর্মীদের ৯০ শতাংশের বেশি কর্মীর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব ও জর্ডান। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে ৪৮টি দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে নতুন কোনো খাত বা বিকল্প গন্তব্য তৈরি না হওয়ায় এই অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো মধ্যপ্রাচ্যকৈন্দ্রিক রয়ে গেছে।

বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় চেয়ে ৬২ হাজার ৩১৭ জনে, যা তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১ শতাংশ কম। তবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৫ হাজার ২১৪ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই ইতিবাচক সংখ্যার আড়ালে রয়েছে নারী কর্মীদের ফিরে আসার দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। বিদেশফেরত অনেক নারী কর্মীই সেখানে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, একাধিক বাড়িতে কাজ করানো এবং নিয়মিত বেতন ও খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।

নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসা এমনই একজন মানিকগঞ্জের অঞ্জনা। গত ২০ মার্চ সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা এই নারী সেখানে ছিলেন মাত্র ১ মাস ৩ দিন। এর মধ্যে মাত্র ৫ দিন কাজ করতে পেরেছেন তিনি। বাকি সময়টা তাকে কাটাতে হয়েছে সে দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে। শেষ পর্যন্ত নিজের টাকা দিয়ে টিকিট কেটে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। ২০১২ সাল থেকে লেবানন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে কাজ করা অঞ্জনা জানান, এর আগে কখনো এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার হয়নি। তার অভিযোগ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সৌদিতে নারী কর্মী পাঠালেই টাকা পায়, তাই তারা কাজ নিশ্চিত না করেই নারীদের পাঠিয়ে দেয়।

একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে নরসিংদীর সানজীদা আখতারের। এক বছর আগে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা সানজীদা সেখানে ছিলেন ২ মাস ২৫ দিন। নিয়োগকর্তা তাকে নিজের বাড়ির পাশাপাশি তার মা ও শ্বশুরবাড়িতেও কাজ করাতেন। সানজীদা জানান, তাকে শুধু রুটি খেতে দেওয়া হতো। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসে ফেরত দেওয়া হয় এবং সেখানে শুরু হয় নতুন করে নির্যাতন। অবশেষে নিজের টাকায় টিকিট কেটে দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি।

বেসরকারি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম জানান, নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসা নারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো বিচার পান না। এই বাস্তবতায় অন্য নারীরাও এখন সচেতন হচ্ছেন। ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রতি তাদের অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ওকাপের কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, আগে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে নারীরা বিদেশে গেলেও এখন আর তারা যেতে চাইছেন না, বরং তাদের পরিবর্তে পুরুষেরা যাচ্ছেন। ওকাপের গত বছরের একটি গবেষণা বলছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির এবং ৮২ শতাংশ ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মঘণ্টার শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, নারীদের এক কাজের কথা বলে নিয়ে একাধিক কাজ করানো হচ্ছে এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নারীদের বিদেশে না যাওয়াই ভালো বলে মনে করেন তিনি। নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা পরের দুই বছর বাড়লেও ২০২৩ (2023) সালে তা আবার কমে আসে। ফিরে আসা কর্মীদের বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, রামরু, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ), নারী শ্রমিক কেন্দ্রের মতো সংগঠন। ব্র্যাকের মতে, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় অনেক এগিয়ে গেছে এবং প্রয়োজনে কর্মী পাঠানো বন্ধও করে দেয়, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

এসব সমস্যার বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নারীদের ভীতি দূর করতে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং সৌদি আরবে সেফ হোম চালু থাকায় নির্যাতন কমেছে। এর পাশাপাশি সরকার এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ কর্মীর বাজারে নজর দিচ্ছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিংয়ের মতো কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আর কখনো বিদেশে যেতে চান না তিনি।২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এক লাখের বেশি হারে নারী কর্মী বিদেশে গেছেন প্রতিবছর।

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এই সংখ্যা কমে আসে।