লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই বিপ্লবের বয়ান ও বাস্তবতা: অর্জনের পথে চ্যালেঞ্জসমূহ

রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বয়ানেরও লড়াই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমরা জানি, ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি একে ‘হেজেমনি’ বলে অভিহিত করেছেন। শাসকশ্রেণি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে শাসন করে না, বরং মানুষের ভাবনার জগৎ দখল করে এবং ইতিহাসের একচেটিয়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে শাসন বজায় রাখে। বিগত ফ্যাসিবাদী জমানার বাংলাদেশ ছিল এর জ্বলন্ত সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতির সর্বজনীন গৌরবকে একটি দল, একটি পরিবার এবং একজন ব্যক্তির তালুক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেই আরোপিত বয়ানের ছায়াতলে গুম, খুন, আয়নাঘর এবং ভোটাধিকার হরণের মতো ঘটনা ঘটেছে, আর ভিন্নমত মাত্রই ‘রাজাকার’ তকমায় দলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই আরোপিত বয়ানের বিরুদ্ধে জনগণের চূড়ান্ত রায়। আজ সেই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জাতির সামনে মৌলিক জিজ্ঞাসা—জুলাইয়ের নিজস্ব বয়ান কি আমরা নির্মাণ করতে পেরেছি আর সেই বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব কতখানি?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্মরণ করা জরুরি। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙা, ১৯৫২ সালে ভাষার মর্যাদা রক্ষা, ১৯৬৯ সালে আইয়ুবি স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপানো, ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯০ সালে এরশাদি স্বৈরাচার বিদায়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাই ছিল সর্বশেষ ও সম্ভবত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। কিন্তু প্রতিটি জাগরণের পর একটি অভিন্ন ট্র্যাজেডি জাতিকে তাড়া করেছে—অর্জন আর আকাঙ্ক্ষার মাঝখানে বেঈমানির প্রাচীর। রক্ত দিয়েছে জনগণ, ফসল ঘরে তুলেছে সুবিধাবাদীরা। মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন তার ‘অ্যানাটমি অব রেভল্যুশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রতিটি বিপ্লবের একটি জীবনচক্র আছে; ফরাসি বিপ্লবের ‘থার্মিডর’ পর্বে বিপ্লবের সন্তানরা পরস্পরকে গিলে খেয়েছিল এবং সেই ফাঁক গলে পুরোনো শক্তি নতুন লেবাসে ফিরে এসেছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা তিন জোটের রূপরেখার কাগজে বন্দি থাকার খেসারত জাতি দিয়েছে এক ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে। জুলাই সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হবে কি না—এটিই আজকের মীমাংসার বিষয়।

জুলাই অভ্যুত্থান নিছক একটি সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে যাত্রা শুরু করলেও অচিরেই তা বৈষম্য, দুঃশাসন, লুটপাটতন্ত্র এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় জাগরণে রূপ নেয়। আবু সাঈদের প্রসারিত বুক এবং মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি’—এসব শুধু আবেগের স্মারক নয়, এগুলো নতুন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাচিহ্ন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে প্রায় দেড় হাজার শহীদ, অগণিত আহত, চোখহারা ও পঙ্গু তরুণের আত্মদানের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। জুলাইয়ের বয়ান কোনো তাত্ত্বিকের টেবিলে রচিত হয়নি; এটি রচিত হয়েছে রাজপথে, দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতিতে এবং তরুণ প্রজন্মের স্লোগানে। একটি প্রজন্ম নিজেই নিজের ইশতেহার লিখেছে রংতুলি আর রক্ত দিয়ে। সেই ইশতেহারের মর্মবাণী ছিল স্পষ্ট—বৈষম্যের অবসান, ভোটাধিকারের পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং জাতীয় মর্যাদার সুরক্ষা।

দুই বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে সৎ আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি—শহীদের সেই আকাঙ্ক্ষার কতটা পূরণ হলো? অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর জাতিকে যেমন আশান্বিত করেছে, তেমনি ক্লান্তও করেছে। সংস্কার কমিশনের পর কমিশন হয়েছে, সুপারিশের স্তূপ জমেছে এবং জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘ দরকষাকষি চলেছে। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা আর জবাবদিহির স্থায়ী বন্দোবস্তের মৌলিক প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ মীমাংসা এখনো হয়নি। তবে এ কথা মানতেই হবে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ দেড় দশক পর তাদের কেড়ে নেওয়া ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। যে দেশে ভোটের আগের রাতে বাক্স ভরা হতো, দিনের ভোট রাতে হতো, সেখানে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে নিজের প্রতিনিধি বেছে নিয়েছে—এ অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জনগণের রায়ে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট পেয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি ১৭ বছর জেল-জুলুম, গুম-খুন, মিথ্যা মামলার পাহাড় ডিঙিয়ে জনগণের কাতারে থেকেছে; দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপসহীনতার যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা এ ম্যান্ডেটের নৈতিক ভিত্তি রচনা করেছে।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ক্ষমতাসীনদের শীর্ষজনের সদিচ্ছার কিছু উজ্জ্বল আলামত জাতি এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। বিজয়ের রাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিকে যে বার্তা দিয়েছেন—প্রতিহিংসা নয়, প্রতিদান; প্রতিশোধ নয়, রাষ্ট্র মেরামত—তা পরাজিতের প্রতি বিজয়ীর ঔদার্যের এক ব্যতিক্রমী নজির। একদা যারা তাকে ফাঁসির দড়ি দেখিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তিনি আইনের শাসনের বাইরে এক পা-ও হাঁটেননি। রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় দ্বিকক্ষের আইনসভা, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা—যেসব অঙ্গীকার তিনি নির্বাচনের বহু আগেই জাতির সামনে হাজির করেছিলেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সরকারে ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অংশীদার করার যে প্রয়াস দেখা যাচ্ছে, তা-ও প্রশংসার দাবি রাখে। এ যেন শহীদ জিয়ার সেই রাজনীতিরই উত্তরাধিকার, যিনি বিভাজন নয়, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ছাতার নিচে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দর্শন রেখে গিয়েছিলেন। খাল কেটে, মাটি ও মানুষের কাছে গিয়ে যিনি প্রমাণ করেছিলেন রাষ্ট্রনায়কের আসন সচিবালয়ে নয়, জনতার দুয়ারে—তার উত্তরসূরির কাছে জাতির প্রত্যাশা তাই স্বভাবতই আকাশচুম্বী। গুম-খুনের বিচারের আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এসব সদিচ্ছার মূল্য অস্বীকার করা হবে অকৃতজ্ঞতা।

কিন্তু রাজনীতির নির্মম পাঠ এই যে, শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছাই শেষ কথা নয়। সদিচ্ছা আর বাস্তবায়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মরচে ধরা আমলাতন্ত্র, সুবিধাবাদীদের ভিড় আর চাটুকারের বেষ্টনী। ক্ষমতার বারান্দায় এরই মধ্যে সেই চেনা মুখের আনাগোনা শুরু হয়েছে, যারা সব আমলেই বসন্তের কোকিল। তৃণমূলে দখল-চাঁদাবাজির যেসব অভিযোগ উঠছে, তা শীর্ষ নেতৃত্বের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দলের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর হবে। ফ্যাসিবাদ কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি ব্যবস্থার নাম; সেই ব্যবস্থার শিকড় প্রশাসনে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতির অঙ্গনে এখনো সম্পূর্ণ উৎপাটিত হয়নি। রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ পরাজিত, কিন্তু গ্রামসির ভাষায় ‘সিভিল সোসাইটির’ দুর্গগুলোতে তার আধিপত্যের অবশেষ রয়ে গেছে। আওয়ামী জমানার সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এখনো দিল্লির দিকে তাকিয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রহর গুনছেন এবং পরিকল্পিত প্রতিবয়ান ছড়াচ্ছেন—জুলাই নাকি ছিল ‘ষড়যন্ত্র’, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’, ‘বিদেশি চক্রান্ত’। এই প্রতিবয়ানের জবাব দিতে হবে ইতিহাসের নির্মোহ দলিল দিয়ে—পাঠ্যপুস্তকে, গবেষণায়, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে জুলাইকে লিপিবদ্ধ করে। বয়ান নির্মাণের এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকলে আগামী প্রজন্মের কাছে জুলাই পৌঁছাবে বিকৃত চেহারায়।

বয়ানের সংকট শুধু শত্রুশিবির থেকে আসছে না, আসছে ঘরের ভেতর থেকেও। যে অভ্যুত্থান ছিল দল-মত-শ্রেণি নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত মহাকাব্য, তাকে আজ কেউ কেউ নিজেদের একক কৃতিত্বের খতিয়ানে তুলতে ব্যস্ত। কারো দাবি, জুলাই তাদের একার সৃষ্টি; কেউ আবার প্রতিপক্ষকে খাটো করতে গিয়ে পুরো অভ্যুত্থানকেই ‘নিছক ক্ষমতার পালাবদল’ বলে নাকচ করছেন। অথচ সত্য এই যে, জুলাই কারো তালুক নয়। সতেরো বছরের আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী কর্মীদের যে ৬০ লাখ মামলা, যে অগণিত গুম-খুনের শিকার, তা যেমন জুলাইয়ের প্রস্তুতিপর্ব; তেমনি রাজপথে বুক পেতে দেওয়া ছাত্র-জনতা, মাদরাসার তালিবে ইলম, শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহিণী—সবার রক্ত ও অশ্রু মিলেই জুলাই। এই যৌথ মালিকানার স্বীকৃতিই জুলাইয়ের বয়ানের প্রাণভোমরা; একে খণ্ডিত করা মানে শহীদের সঙ্গে বেঈমানি। অন্তর্বর্তী পর্বে যে ‘মব’ সংস্কৃতির বাড়াবাড়ি দেখা গিয়েছিল, প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে যে বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়েছিল, পতিত শক্তি আজ সেগুলোকেই অস্ত্র বানিয়ে গোটা অভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। কাজেই আইনের শাসনের প্রতিটি ব্যত্যয় শুধু সরকারের ব্যর্থতা নয়, জুলাইয়ের বয়ানের গায়ে কালিমা—এ উপলব্ধি সংশ্লিষ্ট সবার থাকা চাই।

বিপ্লবের বয়ান টেকে ভাতের থালায়, শুধু স্লোগানে নয়। রুটি-রুজির প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে মহত্তম বয়ানও জনমন থেকে ফিকে হয়ে যায়—ক্ষমতাসীনদের এ সত্য বিস্মৃত হলে চলবে না। একই কথা ভূরাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য—কোনো প্রশ্নেই নতজানু হওয়ার অবকাশ নেই। জুলাই ছিল অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি বহিরাগত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও জাতীয় আত্মমর্যাদার ঘোষণা; মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই সে ঘোষণার যথার্থ অনুবাদ। তাহলে জুলাই কি ব্যর্থ? এমন সিদ্ধান্ত হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—বিপ্লব-প্রক্রিয়ার প্রথম দুই ধাপ সম্পন্ন। এখন চলছে তৃতীয় ও কঠিনতম ধাপ—প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্টিংটন বলেছিলেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের আসল পরীক্ষা প্রথম নির্বাচনে নয়, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদলের ধারাবাহিকতায়। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে জুলাই শক্তির অনৈক্যের বিলাসিতা পরিহার করতে হবে। অভ্যুত্থানের অংশীদারদের মধ্যে আজ যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আর কাদা-ছোড়াছুড়ি, তা দেখে শহীদের আত্মা নিশ্চয়ই ব্যথিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী, বিপ্লবীদের বিভাজনই প্রতিবিপ্লবের প্রধান পুঁজি। মতভেদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য; কিন্তু ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব আর শহীদের রক্তের মর্যাদার প্রশ্নে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীনদের প্রতি নিবেদন—ক্ষমতা বিনয়ী হলে জাতি উপকৃত হয়, অহংকারী হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। জুলাইয়ের ম্যান্ডেট কোনো দলের জমিদারি নয়; এ আমানত বৈষম্যহীন, মর্যাদাপূর্ণ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের। শীর্ষ নেতৃত্ব সে আমানতের মর্ম বোঝেন বলেই জাতি আশাবাদী; সেই বোঝাপড়া গোটা দল ও প্রশাসনে সঞ্চারিত করাই এখন তাদের অগ্নিপরীক্ষা।

পরিশেষে বলি, বয়ান ও বাস্তবতার দূরত্বই যেকোনো বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে, জাতিগুলো শত্রুর হাতে যতটা না পরাজিত হয়, তার চেয়ে বেশি পরাজিত হয় নিজেদের বিস্মৃতি আর বিভাজনের কাছে। দুই বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়, আবার খুব কমও নয়। এ সময়ে যা অর্জিত হয়েছে, তা উদযাপনযোগ্য; যা হয়নি, তা নিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা আত্মঘাতী। ফরাসি লেখক আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, প্রতিটি বিপ্লবী শেষ পর্যন্ত হয় নিপীড়কে পরিণত হয়, নয় স্বপ্নচ্যুত হয়। জুলাইয়ের কুশীলবদের সামনে তৃতীয় একটি পথ খোলা আছে—শহীদের আমানতের বিশ্বস্ত রূপকার হওয়া। আবু সাঈদরা বুক পেতে দিয়েছিল কোনো পদপদবির জন্য নয়; দিয়েছিল এমন এক বাংলাদেশের জন্য, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের, বন্দুক নয় ব্যালটই হবে ক্ষমতার উৎস আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না গুম-খুনের অভিশাপে। সেই বাংলাদেশ এখনো নির্মাণাধীন। বয়ান আমরা পেয়েছি শহীদের রক্তে; বাস্তবতা নির্মাণের দায় আমাদের—জীবিতদের। এ দায় এড়ানোর কোনো পথ ইতিহাস খোলা রাখেনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিলেটের কিনব্রিজ থেকে সরছে ‘আই লাভ সিলেট’ সাইনেজ

জুলাই বিপ্লবের বয়ান ও বাস্তবতা: অর্জনের পথে চ্যালেঞ্জসমূহ

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বয়ানেরও লড়াই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমরা জানি, ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি একে ‘হেজেমনি’ বলে অভিহিত করেছেন। শাসকশ্রেণি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে শাসন করে না, বরং মানুষের ভাবনার জগৎ দখল করে এবং ইতিহাসের একচেটিয়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে শাসন বজায় রাখে। বিগত ফ্যাসিবাদী জমানার বাংলাদেশ ছিল এর জ্বলন্ত সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতির সর্বজনীন গৌরবকে একটি দল, একটি পরিবার এবং একজন ব্যক্তির তালুক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেই আরোপিত বয়ানের ছায়াতলে গুম, খুন, আয়নাঘর এবং ভোটাধিকার হরণের মতো ঘটনা ঘটেছে, আর ভিন্নমত মাত্রই ‘রাজাকার’ তকমায় দলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই আরোপিত বয়ানের বিরুদ্ধে জনগণের চূড়ান্ত রায়। আজ সেই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জাতির সামনে মৌলিক জিজ্ঞাসা—জুলাইয়ের নিজস্ব বয়ান কি আমরা নির্মাণ করতে পেরেছি আর সেই বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব কতখানি?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্মরণ করা জরুরি। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙা, ১৯৫২ সালে ভাষার মর্যাদা রক্ষা, ১৯৬৯ সালে আইয়ুবি স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপানো, ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯০ সালে এরশাদি স্বৈরাচার বিদায়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাই ছিল সর্বশেষ ও সম্ভবত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। কিন্তু প্রতিটি জাগরণের পর একটি অভিন্ন ট্র্যাজেডি জাতিকে তাড়া করেছে—অর্জন আর আকাঙ্ক্ষার মাঝখানে বেঈমানির প্রাচীর। রক্ত দিয়েছে জনগণ, ফসল ঘরে তুলেছে সুবিধাবাদীরা। মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন তার ‘অ্যানাটমি অব রেভল্যুশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রতিটি বিপ্লবের একটি জীবনচক্র আছে; ফরাসি বিপ্লবের ‘থার্মিডর’ পর্বে বিপ্লবের সন্তানরা পরস্পরকে গিলে খেয়েছিল এবং সেই ফাঁক গলে পুরোনো শক্তি নতুন লেবাসে ফিরে এসেছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা তিন জোটের রূপরেখার কাগজে বন্দি থাকার খেসারত জাতি দিয়েছে এক ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে। জুলাই সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হবে কি না—এটিই আজকের মীমাংসার বিষয়।

জুলাই অভ্যুত্থান নিছক একটি সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে যাত্রা শুরু করলেও অচিরেই তা বৈষম্য, দুঃশাসন, লুটপাটতন্ত্র এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় জাগরণে রূপ নেয়। আবু সাঈদের প্রসারিত বুক এবং মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি’—এসব শুধু আবেগের স্মারক নয়, এগুলো নতুন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাচিহ্ন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে প্রায় দেড় হাজার শহীদ, অগণিত আহত, চোখহারা ও পঙ্গু তরুণের আত্মদানের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। জুলাইয়ের বয়ান কোনো তাত্ত্বিকের টেবিলে রচিত হয়নি; এটি রচিত হয়েছে রাজপথে, দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতিতে এবং তরুণ প্রজন্মের স্লোগানে। একটি প্রজন্ম নিজেই নিজের ইশতেহার লিখেছে রংতুলি আর রক্ত দিয়ে। সেই ইশতেহারের মর্মবাণী ছিল স্পষ্ট—বৈষম্যের অবসান, ভোটাধিকারের পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং জাতীয় মর্যাদার সুরক্ষা।

দুই বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে সৎ আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি—শহীদের সেই আকাঙ্ক্ষার কতটা পূরণ হলো? অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর জাতিকে যেমন আশান্বিত করেছে, তেমনি ক্লান্তও করেছে। সংস্কার কমিশনের পর কমিশন হয়েছে, সুপারিশের স্তূপ জমেছে এবং জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘ দরকষাকষি চলেছে। কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা আর জবাবদিহির স্থায়ী বন্দোবস্তের মৌলিক প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ মীমাংসা এখনো হয়নি। তবে এ কথা মানতেই হবে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ দেড় দশক পর তাদের কেড়ে নেওয়া ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। যে দেশে ভোটের আগের রাতে বাক্স ভরা হতো, দিনের ভোট রাতে হতো, সেখানে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে নিজের প্রতিনিধি বেছে নিয়েছে—এ অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জনগণের রায়ে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট পেয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি ১৭ বছর জেল-জুলুম, গুম-খুন, মিথ্যা মামলার পাহাড় ডিঙিয়ে জনগণের কাতারে থেকেছে; দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপসহীনতার যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা এ ম্যান্ডেটের নৈতিক ভিত্তি রচনা করেছে।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ক্ষমতাসীনদের শীর্ষজনের সদিচ্ছার কিছু উজ্জ্বল আলামত জাতি এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। বিজয়ের রাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিকে যে বার্তা দিয়েছেন—প্রতিহিংসা নয়, প্রতিদান; প্রতিশোধ নয়, রাষ্ট্র মেরামত—তা পরাজিতের প্রতি বিজয়ীর ঔদার্যের এক ব্যতিক্রমী নজির। একদা যারা তাকে ফাঁসির দড়ি দেখিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তিনি আইনের শাসনের বাইরে এক পা-ও হাঁটেননি। রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় দ্বিকক্ষের আইনসভা, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা—যেসব অঙ্গীকার তিনি নির্বাচনের বহু আগেই জাতির সামনে হাজির করেছিলেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে সরকারে ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অংশীদার করার যে প্রয়াস দেখা যাচ্ছে, তা-ও প্রশংসার দাবি রাখে। এ যেন শহীদ জিয়ার সেই রাজনীতিরই উত্তরাধিকার, যিনি বিভাজন নয়, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ছাতার নিচে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দর্শন রেখে গিয়েছিলেন। খাল কেটে, মাটি ও মানুষের কাছে গিয়ে যিনি প্রমাণ করেছিলেন রাষ্ট্রনায়কের আসন সচিবালয়ে নয়, জনতার দুয়ারে—তার উত্তরসূরির কাছে জাতির প্রত্যাশা তাই স্বভাবতই আকাশচুম্বী। গুম-খুনের বিচারের আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এসব সদিচ্ছার মূল্য অস্বীকার করা হবে অকৃতজ্ঞতা।

কিন্তু রাজনীতির নির্মম পাঠ এই যে, শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছাই শেষ কথা নয়। সদিচ্ছা আর বাস্তবায়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মরচে ধরা আমলাতন্ত্র, সুবিধাবাদীদের ভিড় আর চাটুকারের বেষ্টনী। ক্ষমতার বারান্দায় এরই মধ্যে সেই চেনা মুখের আনাগোনা শুরু হয়েছে, যারা সব আমলেই বসন্তের কোকিল। তৃণমূলে দখল-চাঁদাবাজির যেসব অভিযোগ উঠছে, তা শীর্ষ নেতৃত্বের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দলের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর হবে। ফ্যাসিবাদ কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি ব্যবস্থার নাম; সেই ব্যবস্থার শিকড় প্রশাসনে, অর্থনীতিতে, সংস্কৃতির অঙ্গনে এখনো সম্পূর্ণ উৎপাটিত হয়নি। রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ পরাজিত, কিন্তু গ্রামসির ভাষায় ‘সিভিল সোসাইটির’ দুর্গগুলোতে তার আধিপত্যের অবশেষ রয়ে গেছে। আওয়ামী জমানার সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এখনো দিল্লির দিকে তাকিয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রহর গুনছেন এবং পরিকল্পিত প্রতিবয়ান ছড়াচ্ছেন—জুলাই নাকি ছিল ‘ষড়যন্ত্র’, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’, ‘বিদেশি চক্রান্ত’। এই প্রতিবয়ানের জবাব দিতে হবে ইতিহাসের নির্মোহ দলিল দিয়ে—পাঠ্যপুস্তকে, গবেষণায়, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে জুলাইকে লিপিবদ্ধ করে। বয়ান নির্মাণের এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকলে আগামী প্রজন্মের কাছে জুলাই পৌঁছাবে বিকৃত চেহারায়।

বয়ানের সংকট শুধু শত্রুশিবির থেকে আসছে না, আসছে ঘরের ভেতর থেকেও। যে অভ্যুত্থান ছিল দল-মত-শ্রেণি নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত মহাকাব্য, তাকে আজ কেউ কেউ নিজেদের একক কৃতিত্বের খতিয়ানে তুলতে ব্যস্ত। কারো দাবি, জুলাই তাদের একার সৃষ্টি; কেউ আবার প্রতিপক্ষকে খাটো করতে গিয়ে পুরো অভ্যুত্থানকেই ‘নিছক ক্ষমতার পালাবদল’ বলে নাকচ করছেন। অথচ সত্য এই যে, জুলাই কারো তালুক নয়। সতেরো বছরের আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী কর্মীদের যে ৬০ লাখ মামলা, যে অগণিত গুম-খুনের শিকার, তা যেমন জুলাইয়ের প্রস্তুতিপর্ব; তেমনি রাজপথে বুক পেতে দেওয়া ছাত্র-জনতা, মাদরাসার তালিবে ইলম, শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহিণী—সবার রক্ত ও অশ্রু মিলেই জুলাই। এই যৌথ মালিকানার স্বীকৃতিই জুলাইয়ের বয়ানের প্রাণভোমরা; একে খণ্ডিত করা মানে শহীদের সঙ্গে বেঈমানি। অন্তর্বর্তী পর্বে যে ‘মব’ সংস্কৃতির বাড়াবাড়ি দেখা গিয়েছিল, প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে যে বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়েছিল, পতিত শক্তি আজ সেগুলোকেই অস্ত্র বানিয়ে গোটা অভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। কাজেই আইনের শাসনের প্রতিটি ব্যত্যয় শুধু সরকারের ব্যর্থতা নয়, জুলাইয়ের বয়ানের গায়ে কালিমা—এ উপলব্ধি সংশ্লিষ্ট সবার থাকা চাই।

বিপ্লবের বয়ান টেকে ভাতের থালায়, শুধু স্লোগানে নয়। রুটি-রুজির প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে মহত্তম বয়ানও জনমন থেকে ফিকে হয়ে যায়—ক্ষমতাসীনদের এ সত্য বিস্মৃত হলে চলবে না। একই কথা ভূরাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য—কোনো প্রশ্নেই নতজানু হওয়ার অবকাশ নেই। জুলাই ছিল অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি বহিরাগত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও জাতীয় আত্মমর্যাদার ঘোষণা; মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই সে ঘোষণার যথার্থ অনুবাদ। তাহলে জুলাই কি ব্যর্থ? এমন সিদ্ধান্ত হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। স্বৈরাচারের পতন ঘটেছে, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—বিপ্লব-প্রক্রিয়ার প্রথম দুই ধাপ সম্পন্ন। এখন চলছে তৃতীয় ও কঠিনতম ধাপ—প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্টিংটন বলেছিলেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের আসল পরীক্ষা প্রথম নির্বাচনে নয়, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদলের ধারাবাহিকতায়। সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে জুলাই শক্তির অনৈক্যের বিলাসিতা পরিহার করতে হবে। অভ্যুত্থানের অংশীদারদের মধ্যে আজ যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আর কাদা-ছোড়াছুড়ি, তা দেখে শহীদের আত্মা নিশ্চয়ই ব্যথিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী, বিপ্লবীদের বিভাজনই প্রতিবিপ্লবের প্রধান পুঁজি। মতভেদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য; কিন্তু ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব আর শহীদের রক্তের মর্যাদার প্রশ্নে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীনদের প্রতি নিবেদন—ক্ষমতা বিনয়ী হলে জাতি উপকৃত হয়, অহংকারী হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। জুলাইয়ের ম্যান্ডেট কোনো দলের জমিদারি নয়; এ আমানত বৈষম্যহীন, মর্যাদাপূর্ণ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের। শীর্ষ নেতৃত্ব সে আমানতের মর্ম বোঝেন বলেই জাতি আশাবাদী; সেই বোঝাপড়া গোটা দল ও প্রশাসনে সঞ্চারিত করাই এখন তাদের অগ্নিপরীক্ষা।

পরিশেষে বলি, বয়ান ও বাস্তবতার দূরত্বই যেকোনো বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু। ইতিহাসের নির্মম সত্য এই যে, জাতিগুলো শত্রুর হাতে যতটা না পরাজিত হয়, তার চেয়ে বেশি পরাজিত হয় নিজেদের বিস্মৃতি আর বিভাজনের কাছে। দুই বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়, আবার খুব কমও নয়। এ সময়ে যা অর্জিত হয়েছে, তা উদযাপনযোগ্য; যা হয়নি, তা নিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা আত্মঘাতী। ফরাসি লেখক আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, প্রতিটি বিপ্লবী শেষ পর্যন্ত হয় নিপীড়কে পরিণত হয়, নয় স্বপ্নচ্যুত হয়। জুলাইয়ের কুশীলবদের সামনে তৃতীয় একটি পথ খোলা আছে—শহীদের আমানতের বিশ্বস্ত রূপকার হওয়া। আবু সাঈদরা বুক পেতে দিয়েছিল কোনো পদপদবির জন্য নয়; দিয়েছিল এমন এক বাংলাদেশের জন্য, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের, বন্দুক নয় ব্যালটই হবে ক্ষমতার উৎস আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না গুম-খুনের অভিশাপে। সেই বাংলাদেশ এখনো নির্মাণাধীন। বয়ান আমরা পেয়েছি শহীদের রক্তে; বাস্তবতা নির্মাণের দায় আমাদের—জীবিতদের। এ দায় এড়ানোর কোনো পথ ইতিহাস খোলা রাখেনি।