লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের টানে কেন ছুটে আসেন মানুষ

কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থল। প্রায় আড়াইশ বছরের প্রাচীন এই মসজিদে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ। রোগমুক্তি, সন্তান লাভ, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা মানসিক প্রশান্তির আশায় মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন এবং বিপুল পরিমাণ দান করেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার এই মসজিদ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়।

মসজিদটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর দানবাক্সগুলো। প্রতি তিন-চার মাস পরপর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই বাক্সগুলো খোলা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৭ জুন, ৩ মাস ২৭ দিন পর মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। নগদ টাকার পাশাপাশি সেখানে মেলে স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা, চাল, কুরআন শরিফ, জায়নামাজ, মোমবাতি ও আগরবাতি। এমনকি অনেকে গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগিও দান হিসেবে নিয়ে আসেন। এই বিপুল অর্থ কেবল মসজিদের ব্যাংক হিসাবেই জমা থাকে না, বরং তা বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানিয়েছেন, জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, মসজিদের পরিধি বাড়াতে আগের সাড়ে পাঁচ একর জায়গার পাশে আরও ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের মোট আয়তন প্রায় ৩ একর ৮৮ শতাংশ, যার সূচনা হয়েছিল হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির ওয়াকফ করা মাত্র ১০ শতাংশ জমি নিয়ে।

তবে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে দান করলেই মনোবাসনা পূরণ হবে—এমন বিশ্বাসের ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। আলেমদের একটি অংশ মনে করেন, মসজিদে দান করা সওয়াবের কাজ হলেও এমন বিশ্বাস ইসলামের মূল আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দানের একমাত্র নিয়ত হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পাগলা মসজিদটি মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে গেছে।

এই মসজিদের নামকরণের পেছনে একাধিক লোককথা প্রচলিত আছে। একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, এক আধ্যাত্মিক পাগলবেশী ব্যক্তি খরস্রোতা নরসুন্দা নদীতে মাদুর পেতে ভেসে এসে এখানে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর সমাধির পাশে মসজিদটি গড়ে ওঠে। অন্য মতে, হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিল কদর নামের এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তেন, যাঁর নাম থেকে ‘পাগলা মসজিদ’ নামের উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, জমিদার পরিবারের নারী পাগলা বিবির নামানুসারে এই নামকরণ হয়েছে।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও তিনতলা বিশিষ্ট এই মসজিদটি অনন্য। এর ছাদে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ এবং একটি পাঁচতলা ভবনের সমান সুউচ্চ মিনার। বর্তমানে এখানে একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, যেখানে নারী ও পুরুষদের জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে তুরস্কের বসফরাস প্রণালীর তীরের একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদের আদলে এখানে প্রায় ১০ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পুরুষ এবং পৃথকভাবে ৫ হাজার নারী মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে।

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ যাতায়াতও বেশ সহজ। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তনগর ট্রেনে সরাসরি কিশোরগঞ্জ যাওয়া যায়। এছাড়া মহাখালী ও গোলাপবাগ থেকে বাসে চড়ে কিশোরগঞ্জের গাইটাল আন্তনগর বাস টার্মিনালে নেমে অটোরিকশায় সহজেই পৌঁছানো যায় ঐতিহাসিক এই পাগলা মসজিদে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউক্রেনকে ৮৫ হাজার কোটি টাকার সামরিক সহায়তা দেবে ইউরোপীয় কমিশন

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের টানে কেন ছুটে আসেন মানুষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৩:৩২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থল। প্রায় আড়াইশ বছরের প্রাচীন এই মসজিদে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ। রোগমুক্তি, সন্তান লাভ, ব্যবসায়িক সাফল্য কিংবা মানসিক প্রশান্তির আশায় মানুষ এখানে নামাজ আদায় করেন এবং বিপুল পরিমাণ দান করেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার এই মসজিদ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়।

মসজিদটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর দানবাক্সগুলো। প্রতি তিন-চার মাস পরপর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই বাক্সগুলো খোলা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৭ জুন, ৩ মাস ২৭ দিন পর মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। নগদ টাকার পাশাপাশি সেখানে মেলে স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা, চাল, কুরআন শরিফ, জায়নামাজ, মোমবাতি ও আগরবাতি। এমনকি অনেকে গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগিও দান হিসেবে নিয়ে আসেন। এই বিপুল অর্থ কেবল মসজিদের ব্যাংক হিসাবেই জমা থাকে না, বরং তা বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানিয়েছেন, জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, মসজিদের পরিধি বাড়াতে আগের সাড়ে পাঁচ একর জায়গার পাশে আরও ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের মোট আয়তন প্রায় ৩ একর ৮৮ শতাংশ, যার সূচনা হয়েছিল হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির ওয়াকফ করা মাত্র ১০ শতাংশ জমি নিয়ে।

তবে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে দান করলেই মনোবাসনা পূরণ হবে—এমন বিশ্বাসের ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। আলেমদের একটি অংশ মনে করেন, মসজিদে দান করা সওয়াবের কাজ হলেও এমন বিশ্বাস ইসলামের মূল আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দানের একমাত্র নিয়ত হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে পাগলা মসজিদটি মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে গেছে।

এই মসজিদের নামকরণের পেছনে একাধিক লোককথা প্রচলিত আছে। একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, এক আধ্যাত্মিক পাগলবেশী ব্যক্তি খরস্রোতা নরসুন্দা নদীতে মাদুর পেতে ভেসে এসে এখানে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর সমাধির পাশে মসজিদটি গড়ে ওঠে। অন্য মতে, হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিল কদর নামের এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি এখানে নিয়মিত নামাজ পড়তেন, যাঁর নাম থেকে ‘পাগলা মসজিদ’ নামের উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ মনে করেন, জমিদার পরিবারের নারী পাগলা বিবির নামানুসারে এই নামকরণ হয়েছে।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও তিনতলা বিশিষ্ট এই মসজিদটি অনন্য। এর ছাদে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ এবং একটি পাঁচতলা ভবনের সমান সুউচ্চ মিনার। বর্তমানে এখানে একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, যেখানে নারী ও পুরুষদের জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে তুরস্কের বসফরাস প্রণালীর তীরের একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদের আদলে এখানে প্রায় ১০ তলা বিশিষ্ট একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পুরুষ এবং পৃথকভাবে ৫ হাজার নারী মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে।

ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ যাতায়াতও বেশ সহজ। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তনগর ট্রেনে সরাসরি কিশোরগঞ্জ যাওয়া যায়। এছাড়া মহাখালী ও গোলাপবাগ থেকে বাসে চড়ে কিশোরগঞ্জের গাইটাল আন্তনগর বাস টার্মিনালে নেমে অটোরিকশায় সহজেই পৌঁছানো যায় ঐতিহাসিক এই পাগলা মসজিদে।