লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
১২:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সবজির বাজারে আগুন, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা

দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে ঢাকার কাঁচাবাজারে সবজির সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামের ওপর। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বেশির ভাগ সবজিই ১০০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ মানের কাঁচা মরিচের দাম রেকর্ড ছুঁয়ে প্রতি কেজি ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে।

গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে ঢাকার কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর টাউন হলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের চরম ক্ষোভ ও ভোগান্তি দেখা গেছে। বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ১২০ টাকা, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শসা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পটলের কেজি ৮০ টাকা, লাল টমেটো ১৪০ টাকা, উন্নত মানের গাজর ১৬০ টাকা এবং কাঁকরোল ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক সপ্তাহ আগে ৬০ টাকায় পাওয়া লাউ এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। তুলনামূলক কম দামে কেবল পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। মিষ্টি কুমড়া প্রতি পিস ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। মোহাম্মদপুর টাউন হলে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগেও যেসব সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেতনের টাকা দিয়ে সপ্তাহের বাজার করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সালমা বেগম নামের আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র চার-পাঁচ ধরনের সবজি আর সামান্য কাঁচা মরিচ কিনতেই প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের বিপদ আরও বাড়বে।

সরবরাহ সংকটের বিষয়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, যশোর, নরসিংদী, বগুড়া ও কুমিল্লাসহ দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো বৃষ্টিতে প্লাবিত হওয়ায় কৃষকরা সময়মতো ফসল তুলতে পারছেন না। মোহাম্মদপুর টাউন হলের সবজি বিক্রেতা মো. এরশাদ জানান, আড়ত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং অনেক সবজি পথেই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়তদার হাজি মো. রাজিব হোসেন বলেন, ঢাকায় আসার পথে অনেক পচনশীল সবজি নষ্ট হচ্ছে, ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। ঘাটে পরিবহনের জট তৈরি হওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম।

তবে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এই দাম বৃদ্ধির কারণ মানতে নারাজ বাজার বিশ্লেষক ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমলেও দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। পাইকারি ও খুচরায় দামের ব্যবধান অনেক বেশি। এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বৃষ্টির অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিদিন পাইকারি ক্রয়ের রশিদ ও খুচরা বিক্রির মূল্য যাচাই করা হচ্ছে এবং অনিয়ম পেলে জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হবে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বিকল্প হিসেবে অন্য এলাকা থেকে সবজি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পরিবহন চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে ট্রাকে করে সুলভ মূল্যে সবজি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টি কমে রোদ উঠলে এবং নতুন করে সবজি উত্তোলন শুরু হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চরফ্যাশনে শিক্ষকের বকেয়া বিল ছাড়াতে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ

টানা বৃষ্টিতে ঢাকার সবজির বাজারে আগুন, কাঁচা মরিচ ২৪০ টাকা

প্রকাশিত হয়েছে: ১০:২৪:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে ঢাকার কাঁচাবাজারে সবজির সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামের ওপর। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বেশির ভাগ সবজিই ১০০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সাধারণ মানের কাঁচা মরিচের দাম রেকর্ড ছুঁয়ে প্রতি কেজি ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে।

গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে ঢাকার কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর টাউন হলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের চরম ক্ষোভ ও ভোগান্তি দেখা গেছে। বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ১২০ টাকা, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শসা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পটলের কেজি ৮০ টাকা, লাল টমেটো ১৪০ টাকা, উন্নত মানের গাজর ১৬০ টাকা এবং কাঁকরোল ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক সপ্তাহ আগে ৬০ টাকায় পাওয়া লাউ এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। তুলনামূলক কম দামে কেবল পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। মিষ্টি কুমড়া প্রতি পিস ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। মোহাম্মদপুর টাউন হলে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগেও যেসব সবজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেতনের টাকা দিয়ে সপ্তাহের বাজার করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সালমা বেগম নামের আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র চার-পাঁচ ধরনের সবজি আর সামান্য কাঁচা মরিচ কিনতেই প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকলে সাধারণ মানুষের বিপদ আরও বাড়বে।

সরবরাহ সংকটের বিষয়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, যশোর, নরসিংদী, বগুড়া ও কুমিল্লাসহ দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো বৃষ্টিতে প্লাবিত হওয়ায় কৃষকরা সময়মতো ফসল তুলতে পারছেন না। মোহাম্মদপুর টাউন হলের সবজি বিক্রেতা মো. এরশাদ জানান, আড়ত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং অনেক সবজি পথেই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়তদার হাজি মো. রাজিব হোসেন বলেন, ঢাকায় আসার পথে অনেক পচনশীল সবজি নষ্ট হচ্ছে, ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। ঘাটে পরিবহনের জট তৈরি হওয়ায় সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম।

তবে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগকে এই দাম বৃদ্ধির কারণ মানতে নারাজ বাজার বিশ্লেষক ও ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমলেও দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে। পাইকারি ও খুচরায় দামের ব্যবধান অনেক বেশি। এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বৃষ্টির অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিদিন পাইকারি ক্রয়ের রশিদ ও খুচরা বিক্রির মূল্য যাচাই করা হচ্ছে এবং অনিয়ম পেলে জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হবে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বিকল্প হিসেবে অন্য এলাকা থেকে সবজি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পরিবহন চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজারে স্বস্তি ফেরাতে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে ট্রাকে করে সুলভ মূল্যে সবজি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টি কমে রোদ উঠলে এবং নতুন করে সবজি উত্তোলন শুরু হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।