লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০১:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তীব্র গরমে রেকর্ড লোডশেডিং, বিদ্যুৎহীন জেলা-উপজেলায় চরম ভোগান্তি

দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে লোডশেডিং। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র অনুযায়ী, দেশে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি আরও শোচনীয় আকার ধারণ করেছে, যেখানে অনেক এলাকায় দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। মাদারীপুর, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ ও ফেনীর দাগনভূঞার মতো এলাকাগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বিদ্যুতের এই ভেলকিবাজি চলায় অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী জানান, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেন না। শরীর দুর্বল থাকায় সকালে কাজে যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিন কাজে না গেলে ঘরে চাল জোটে না বলে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। একই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কাকিনা বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম ও কোমল পানীয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। চরম ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানায়, সামনে তাদের টেস্ট পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে মোমবাতি বা কুপির আলোতে পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট।

ফেনীর দাগনভূঞা এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কোনো শিডিউল না মেনেই দৈনিক ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টাও লোডশেডিং করা হচ্ছে। অতিষ্ঠ গ্রাহকেরা জোনাল অফিস বা অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করলেও কেউ রিসিভ করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় তারা সরকারি শিডিউল রক্ষা করতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, সেখানে এখন সাশ্রয়ের জন্য ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যা গরম বাড়লে আরও ১-২ ঘণ্টা বেড়ে যায়।

মাদারীপুরেও শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাবে স্থানীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, যার ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। ‘রংয়ের ছোঁয়া প্রেস’-এর মালিক রুবেল মাতুব্বর জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কোনো কাজই করা যাচ্ছে না, ফলে কাস্টমাররা বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছেন এবং তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের জন্য ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট। মাদারীপুর বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মোট ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে এই লোডশেডিং বণ্টন করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র গরমে রেকর্ড লোডশেডিং, বিদ্যুৎহীন জেলা-উপজেলায় চরম ভোগান্তি

তীব্র গরমে রেকর্ড লোডশেডিং, বিদ্যুৎহীন জেলা-উপজেলায় চরম ভোগান্তি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬:২৬:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে লোডশেডিং। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র অনুযায়ী, দেশে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিস্থিতি আরও শোচনীয় আকার ধারণ করেছে, যেখানে অনেক এলাকায় দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। মাদারীপুর, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ ও ফেনীর দাগনভূঞার মতো এলাকাগুলোতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বিদ্যুতের এই ভেলকিবাজি চলায় অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী জানান, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেন না। শরীর দুর্বল থাকায় সকালে কাজে যাওয়াও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিন কাজে না গেলে ঘরে চাল জোটে না বলে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। একই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কাকিনা বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম ও কোমল পানীয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। চরম ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানায়, সামনে তাদের টেস্ট পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে মোমবাতি বা কুপির আলোতে পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট।

ফেনীর দাগনভূঞা এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কোনো শিডিউল না মেনেই দৈনিক ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টাও লোডশেডিং করা হচ্ছে। অতিষ্ঠ গ্রাহকেরা জোনাল অফিস বা অভিযোগ কেন্দ্রে ফোন করলেও কেউ রিসিভ করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় তারা সরকারি শিডিউল রক্ষা করতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, সেখানে এখন সাশ্রয়ের জন্য ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যা গরম বাড়লে আরও ১-২ ঘণ্টা বেড়ে যায়।

মাদারীপুরেও শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাবে স্থানীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, যার ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। ‘রংয়ের ছোঁয়া প্রেস’-এর মালিক রুবেল মাতুব্বর জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কোনো কাজই করা যাচ্ছে না, ফলে কাস্টমাররা বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছেন এবং তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের জন্য ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট। মাদারীপুর বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মোট ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে এই লোডশেডিং বণ্টন করছে।