লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৯:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে মামলার জট, রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে মাদক, হত্যা, চুরি ও সাইবার অপরাধের মতো প্রায় সব ধরনের ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল ফরেনসিকের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে। ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হওয়ায় থানা পুলিশ ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা সিআইডির ল্যাবে প্রচুর ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাঠাচ্ছে। তবে সেই তুলনায় ডিজিটাল ফরেনসিকের সক্ষমতা না বাড়ায় আলামতের দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সময়মতো ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলার তদন্ত ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সিআইডির ঢাকা ও খুলনা বিভাগীয় ল্যাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত জমা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত নিষ্পত্তি করা গেলেও এখনো ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত ঝুলে আছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে ডিভাইস বিশ্লেষণের চাহিদা ৩৭২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ২০১২ সালে মাত্র ১৮টি আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৬০৩টি মামলায় ১১ হাজার ১১১টি আলামত জমা পড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে ডিভাইস পর্যালোচনা সংক্রান্ত ডিজিটাল প্রতিবেদন। ২০১২ সালে ৭ মামলায় নিষ্পত্তির হার ১০০ শতাংশ ছিল। একইভাবে ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে ২৪ মামলায় ১০০%, ২০১৪ সালে ৫৮ মামলায় ২২.৪১%, ২০১৫ সালে ২৫৭ মামলায় ৭১.৬০% এবং ২০১৬ সালে ৫৩৩ মামলায় ৫৫.৫৩% নিষ্পত্তির হার ছিল।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়ার একটি মামলায় সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শুধু ফরেনসিক মতামতের জন্য ৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা ও মামলার চার্জশিট দাখিলকে বিলম্বিত করছে। কর্মকর্তাদের মতে, পুরনো ডিভাইসের মাধ্যমে আধুনিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও এআই প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন একটি কাজ।

ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা এই স্থবিরতার পেছনে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। এগুলো হলো—প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের উত্থান, আধুনিক এনক্রিপ্টেড ডিভাইস ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের ডেটা উদ্ধারের জটিলতা, ল্যাবের সক্ষমতার চেয়ে আলামতের অতিরিক্ত চাপ এবং আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।

সিআইডির মিডিয়া শাখার সদ্য সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, এই সংকট নিরসনে প্রতিটি বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় চট্টগ্রামে বিভাগীয় ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করবে। আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের মামলার জট উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পিরোজপুরে কাঠবোঝাই ভ্যান উল্টে দিনমজুর নিহত, শিশু সন্তান আহত

ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে মামলার জট, রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

প্রকাশিত হয়েছে: ০২:০৬:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে মাদক, হত্যা, চুরি ও সাইবার অপরাধের মতো প্রায় সব ধরনের ফৌজদারি মামলায় ডিজিটাল ফরেনসিকের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে। ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হওয়ায় থানা পুলিশ ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা সিআইডির ল্যাবে প্রচুর ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাঠাচ্ছে। তবে সেই তুলনায় ডিজিটাল ফরেনসিকের সক্ষমতা না বাড়ায় আলামতের দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সময়মতো ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলার তদন্ত ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সিআইডির ঢাকা ও খুলনা বিভাগীয় ল্যাবের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি আলামত জমা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত নিষ্পত্তি করা গেলেও এখনো ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত ঝুলে আছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে ডিভাইস বিশ্লেষণের চাহিদা ৩৭২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ২০১২ সালে মাত্র ১৮টি আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৬০৩টি মামলায় ১১ হাজার ১১১টি আলামত জমা পড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে ডিভাইস পর্যালোচনা সংক্রান্ত ডিজিটাল প্রতিবেদন। ২০১২ সালে ৭ মামলায় নিষ্পত্তির হার ১০০ শতাংশ ছিল। একইভাবে ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে ২৪ মামলায় ১০০%, ২০১৪ সালে ৫৮ মামলায় ২২.৪১%, ২০১৫ সালে ২৫৭ মামলায় ৭১.৬০% এবং ২০১৬ সালে ৫৩৩ মামলায় ৫৫.৫৩% নিষ্পত্তির হার ছিল।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য গড়ে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী ধরা পড়ার একটি মামলায় সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শুধু ফরেনসিক মতামতের জন্য ৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা ও মামলার চার্জশিট দাখিলকে বিলম্বিত করছে। কর্মকর্তাদের মতে, পুরনো ডিভাইসের মাধ্যমে আধুনিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও এআই প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন একটি কাজ।

ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা এই স্থবিরতার পেছনে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। এগুলো হলো—প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের উত্থান, আধুনিক এনক্রিপ্টেড ডিভাইস ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের ডেটা উদ্ধারের জটিলতা, ল্যাবের সক্ষমতার চেয়ে আলামতের অতিরিক্ত চাপ এবং আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব।

সিআইডির মিডিয়া শাখার সদ্য সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, এই সংকট নিরসনে প্রতিটি বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় চট্টগ্রামে বিভাগীয় ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা দ্রুতই কার্যক্রম শুরু করবে। আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের মামলার জট উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।