লাইভ টিভি ই-পেপার নিউজ পাঠান
০৪:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাল শাপলা তুলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে গেল শিশু ঋতু, ভাই ও চাচ্চুর বুদ্ধিতে রক্ষা

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২৯

টানা বৃষ্টির পর সবেমাত্র আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। বাড়ির পেছনের শ্যাওলা ধরা কালচে পানির পুকুরটিতে ফুটে থাকা একটি চমৎকার লাল শাপলা দেখে চোখ আটকে গেল সাত বছরের শিশু ঋতুর। শাপলাটি তুলে নিজের পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখার তীব্র ইচ্ছা জাগল তার মনে। আশেপাশে কোনো বড় মানুষকে না দেখে গুটিগুটি পায়ে একাই পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে গেল সে।

টানা বর্ষার কারণে পুকুরপাড়ের মাটি তখন সাবানের মতোই পিচ্ছিল হয়ে ছিল। ঋতু যখন ফুলটি ধরার জন্য হাত বাড়াল, তখনই পা পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল পুকুরের পানিতে। সাঁতার না জানা ঋতু বাঁচার চেষ্টায় পুকুরধারের একগাদা কচুরিপানার মধ্যে থাকা একটি সরু ডাল খপ করে আঁকড়ে ধরল। কিন্তু তার শরীরের ভার সইতে না পেরে ডালটি মড়মড় শব্দে ভাঙতে শুরু করল।

ঠিক তখনই উঠোনে খেলতে থাকা ঋতুর এগারো বছর বয়সী বড় ভাই জিতু শব্দ শুনে পুকুরপাড়ে ছুটে আসে। বোনকে ঝুলন্ত ও ডুবন্ত অবস্থায় দেখে তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে দ্রুত নিজের স্যান্ডেল খুলে পানিতে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল যে সে নিজেও সাঁতার জানে না। নিজে ঝাঁপ দিলে দুজনকেই বাঁচানোর কেউ থাকবে না ভেবে সে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত থাকল।

জিতু দ্রুত বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে প্রথমে একটি লম্বা বাঁশের কঞ্চি ঋতুর দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু সেটি ঋতুর নাগালের বাইরে ছিল। এরপর সে উঠোনে থাকা একটি খালি পাঁচ লিটারের প্লাস্টিকের বোতল এনে ঋতুর দিকে ছুড়ে দেয়। কিন্তু ভয়ে কাঁপতে থাকা ঋতু সেটিও ধরতে পারল না। উপায় না দেখে জিতু গলার সব জোর এক করে চিৎকার শুরু করল, 'বাঁচাও! বাঁচাও! চাচ্চু, বাবা, জলদি এসো! ঋতু পুকুরে পড়ে গেছে।'

চিৎকার শুনে ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বের হয়ে এলেন তাদের চাচ্চু। পুকুরের ডালটি তখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে এবং ঋতু পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। একজন দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় চাচ্চু মুহূর্তের মধ্যে পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিলেন। দ্রুত সাঁতরে ঋতুর কাছে পৌঁছে তার ফ্রকের কলার শক্ত করে ধরে টেনে পাড়ে নিয়ে এলেন।

পানি থেকে তোলার পর ঋতু ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছিল এবং কাশছিল। চাচ্চু তাকে দ্রুত একপাশে কাত করে শুইয়ে দিলেন, যাতে ভেতরের পানি সহজে বের হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। এরপর তিনি ঋতুর পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলেন। ঋতুর মনের ভয় কাটাতে চাচ্চু আবার পানিতে নেমে সেই লাল শাপলাটি তুলে এনে তার হাতে দিলেন। কিন্তু ফুলটি হাতে নিতেই ঋতু দেখতে পেল শাপলার কাদামাখা ডাঁটায় একটি পিচ্ছিল শামুক আটকে আছে। ভয়ে 'ও মা গো!' বলে সে ফুলটি মাটিতে ফেলে দিলে উপস্থিত সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

ততক্ষণে খবর পেয়ে বাবা-মা ছুটে এসেছেন। মা ঋতুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চাচ্চুর মুখে পুরো ঘটনা শুনে বাবা জিতুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, সাঁতার না জেনেও পানিতে লাফ না দিয়ে হাতের কাছের জিনিস এগিয়ে দেওয়া এবং চিৎকার করে সাহায্য চাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

এরপর চাচ্চু সিদ্ধান্ত নেন, পুকুরের চারপাশে আজই শক্ত বাঁশের বেড়া দেওয়া হবে এবং আগামী সপ্তাহ থেকেই ঋতু ও জিতু দুজনকে সাঁতার শেখানো হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরের সপ্তাহে চাচ্চু তাদের গ্রামের একটি নিরাপদ ও কম গভীর পুকুরে নিয়ে সাঁতার শেখাতে শুরু করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা দুজনে দারুণ সাঁতারু হয়ে ওঠে।

কিছুদিন পর, পুকুরপাড়ে বাঁশের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে জিতু চোখ টিপে ঋতুকে জিজ্ঞেস করল, সে এখন সাঁতার পারে বলে আবার লাল শাপলা আনতে যাবে কি না। ঋতু খিলখিল করে হেসে মাথা নেড়ে জানাল, শাপলায় শামুক থাকে এবং এগুলো ফুলদানির চেয়ে পুকুরেই বেশি সুন্দর দেখায়। বোনের কথা শুনে জিতু হাসিমুখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভৈরবে অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস, ব্যবসায়ীকে জরিমানা

লাল শাপলা তুলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে গেল শিশু ঋতু, ভাই ও চাচ্চুর বুদ্ধিতে রক্ষা

প্রকাশিত হয়েছে: ০৯:৩৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ২৯

টানা বৃষ্টির পর সবেমাত্র আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। বাড়ির পেছনের শ্যাওলা ধরা কালচে পানির পুকুরটিতে ফুটে থাকা একটি চমৎকার লাল শাপলা দেখে চোখ আটকে গেল সাত বছরের শিশু ঋতুর। শাপলাটি তুলে নিজের পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখার তীব্র ইচ্ছা জাগল তার মনে। আশেপাশে কোনো বড় মানুষকে না দেখে গুটিগুটি পায়ে একাই পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে গেল সে।

টানা বর্ষার কারণে পুকুরপাড়ের মাটি তখন সাবানের মতোই পিচ্ছিল হয়ে ছিল। ঋতু যখন ফুলটি ধরার জন্য হাত বাড়াল, তখনই পা পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল পুকুরের পানিতে। সাঁতার না জানা ঋতু বাঁচার চেষ্টায় পুকুরধারের একগাদা কচুরিপানার মধ্যে থাকা একটি সরু ডাল খপ করে আঁকড়ে ধরল। কিন্তু তার শরীরের ভার সইতে না পেরে ডালটি মড়মড় শব্দে ভাঙতে শুরু করল।

ঠিক তখনই উঠোনে খেলতে থাকা ঋতুর এগারো বছর বয়সী বড় ভাই জিতু শব্দ শুনে পুকুরপাড়ে ছুটে আসে। বোনকে ঝুলন্ত ও ডুবন্ত অবস্থায় দেখে তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে দ্রুত নিজের স্যান্ডেল খুলে পানিতে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল যে সে নিজেও সাঁতার জানে না। নিজে ঝাঁপ দিলে দুজনকেই বাঁচানোর কেউ থাকবে না ভেবে সে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত থাকল।

জিতু দ্রুত বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে প্রথমে একটি লম্বা বাঁশের কঞ্চি ঋতুর দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু সেটি ঋতুর নাগালের বাইরে ছিল। এরপর সে উঠোনে থাকা একটি খালি পাঁচ লিটারের প্লাস্টিকের বোতল এনে ঋতুর দিকে ছুড়ে দেয়। কিন্তু ভয়ে কাঁপতে থাকা ঋতু সেটিও ধরতে পারল না। উপায় না দেখে জিতু গলার সব জোর এক করে চিৎকার শুরু করল, 'বাঁচাও! বাঁচাও! চাচ্চু, বাবা, জলদি এসো! ঋতু পুকুরে পড়ে গেছে।'

চিৎকার শুনে ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বের হয়ে এলেন তাদের চাচ্চু। পুকুরের ডালটি তখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে এবং ঋতু পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। একজন দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় চাচ্চু মুহূর্তের মধ্যে পুকুরের পানিতে ঝাঁপ দিলেন। দ্রুত সাঁতরে ঋতুর কাছে পৌঁছে তার ফ্রকের কলার শক্ত করে ধরে টেনে পাড়ে নিয়ে এলেন।

পানি থেকে তোলার পর ঋতু ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছিল এবং কাশছিল। চাচ্চু তাকে দ্রুত একপাশে কাত করে শুইয়ে দিলেন, যাতে ভেতরের পানি সহজে বের হয়ে যায় এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। এরপর তিনি ঋতুর পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলেন। ঋতুর মনের ভয় কাটাতে চাচ্চু আবার পানিতে নেমে সেই লাল শাপলাটি তুলে এনে তার হাতে দিলেন। কিন্তু ফুলটি হাতে নিতেই ঋতু দেখতে পেল শাপলার কাদামাখা ডাঁটায় একটি পিচ্ছিল শামুক আটকে আছে। ভয়ে 'ও মা গো!' বলে সে ফুলটি মাটিতে ফেলে দিলে উপস্থিত সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

ততক্ষণে খবর পেয়ে বাবা-মা ছুটে এসেছেন। মা ঋতুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চাচ্চুর মুখে পুরো ঘটনা শুনে বাবা জিতুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, সাঁতার না জেনেও পানিতে লাফ না দিয়ে হাতের কাছের জিনিস এগিয়ে দেওয়া এবং চিৎকার করে সাহায্য চাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

এরপর চাচ্চু সিদ্ধান্ত নেন, পুকুরের চারপাশে আজই শক্ত বাঁশের বেড়া দেওয়া হবে এবং আগামী সপ্তাহ থেকেই ঋতু ও জিতু দুজনকে সাঁতার শেখানো হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরের সপ্তাহে চাচ্চু তাদের গ্রামের একটি নিরাপদ ও কম গভীর পুকুরে নিয়ে সাঁতার শেখাতে শুরু করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা দুজনে দারুণ সাঁতারু হয়ে ওঠে।

কিছুদিন পর, পুকুরপাড়ে বাঁশের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে জিতু চোখ টিপে ঋতুকে জিজ্ঞেস করল, সে এখন সাঁতার পারে বলে আবার লাল শাপলা আনতে যাবে কি না। ঋতু খিলখিল করে হেসে মাথা নেড়ে জানাল, শাপলায় শামুক থাকে এবং এগুলো ফুলদানির চেয়ে পুকুরেই বেশি সুন্দর দেখায়। বোনের কথা শুনে জিতু হাসিমুখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।